সামান্য ক্ষতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কথা

বহে মাঘমাসে শীতের বাতাসস্বচ্ছসলিলা বরুণা।পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জ্জনেশিলাময় ঘাট চম্পকবনে;স্নানে চলেছেন শত সখীসনেকাশীর মহিষী করুণা।

সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতেজনহীন রাজশাসনে।নিকটে যে ক’টি আছিল কুটীরছেড়ে গেছে লােক, তাই নদীতীরস্তব্ধ গভীর, কেবল পাখীরকূজন উঠিছে কাননে।

আজি উতরােল উত্তর বায়েউতলা হয়েছে তটিনী।সােনার আলােক পড়িয়াছে জলে,পুলকে উছলি ঢেউ ছলছলে,লক্ষ মানিক ঝলকি আঁচলেনেচে চলে যেন নটিনী।

কলকল্লোলে লাজ দিল আজ।নারীকণ্ঠের কাকলী।মৃণাল ভুজের ললিত বিলাসেচঞ্চলা নদী মাতে উল্লাসে,আলাপে প্রলাপে হাসি-উচ্ছাসেআকাশ উঠিল আকুলি।

স্নান সমাপন করিয়া যখনকূলে উঠে নারী সকলে—মহিষী কহিলা উহু শীতে মরি!সকল শরীর উঠিছে শিহরি!জ্বেলেদে আগুন ওলো সহচরী,শীত নিবারিব অনলে।

সখীগণ সবে কুড়াইতে কুটাচলিল কুসুম কাননে।

কৌতুকরসে পাগল পরাণীশাখা ধরি সবে করে টানাটানি;—সহসা সবারে ডাক দিয়া রাণীকহে সহাস্য আননে;—

ওলো তােরা আয়! ওই দেখা যায়কুটীর কাহার অদূরে!ওই ঘরে তােরা লাগাবি অনল,তপ্ত করিব কর পদতল।এত বলি রাণী রঙ্গে বিভলহাসিয়া উঠিল মধুরে।

কহিল মালতী সকরুণ অতিএকি পরিহাস রাণী মা!আগুন জ্বালায়ে কেন দিবে নাশি?এ কুটীর কোন্ সাধু সন্যাসীকোন্ দীনজন কোন্ পরবাসীবাঁধিয়াছে নাহি জানি মা!

রাণী কহে রােষে—দূর করি দাওএই দীনদয়াময়ীরে!-অতি দুর্দ্দাম কৌতুকরতযৌবনমদে নিষ্ঠুর যতযুবতীরা মিলি পাগলের মতআগুন লাগাল কুটীরে।

ঘন ঘাের ধুম ঘুরিয়া ঘুরিয়াফুলিয়া ফুলিয়া উড়িল।দেখিতে দেখিতে সে ধূম বিদারিঝলকে ঝলকে উল্কা উগারিশত শত লােল জিহ্বা প্রসারিবহ্নি আকাশ জুড়িল।

পাতাল ফুঁড়িয়া উঠিল যেন রেজ্বালাময়ী যত নাগিনী।ফণা নাচাইয়া অম্বরপানেমাতিয়া উঠিল গর্জ্জনগানে,প্রলয়মত্ত রমণীর কানেবাজিল দীপক রাগিণী।

প্রভাত পাখীর আনন্দগানভয়ের বিলাপে টুটিল;—দলে দলে কাক করে কোলাহল,উত্তর বায়ু হইল প্রবল,—কুটীর হইতে কুটীরে অনলউড়িয়া উড়িয়া ছুটিল।

ছােট গ্রামখানি লেহিয়া লইলপ্রলয়-লােলুপ রসনা।

জনহীন পথে মাঘের প্রভাতেপ্রমােদ ক্লান্ত শত সখী সাথেফিরে গেল রাণী কুবলয় হাতেদীপ্ত অরুণ-বসনা।

তখন সভায় বিচার আসনেবসিয়া ছিলেন ভূপতি।গৃহহীন প্রজা দলে দলে আসে,দ্বিধাকম্পিত গদগদ ভাষেনিবেদিল দুখ সঙ্কোচে ত্রাসে।চরণে করিয়া বিনতি।

সভাসন ছাড়ি উঠি গেল রাজারক্তিমমুখ সরমে।অকালে পশিলা রাণীর আগার,—কহিলা মহিষি, একি ব্যবহার?গৃহ জ্বালাইলে অভাগা প্রজারবল কোন্ রাজধরমে?

রুবিয়া কহিলা রাজার মহিলা“গৃহ কহ তারে কি বােধে?গেছে গুটীকত জীর্ণ কুটীরকতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর?

কত ধন যায় রাজমহিষীরএক প্রহরের প্রমোদে।”

কহিলেন রাজা উদ্যতরােষরুধিয়া দীপ্ত হৃদয়ে,—যতদিন তুমি আছ রাজরাণীদীনের কুটীরে দীনের কি হানিবুঝিতে নারিবে জানি তাহা জানি-বুঝব তােমারে নিদয়ে!

রাজার আদেশে কিঙ্করী আসিভূষণ ফেলিল খুলিয়া।অরুণ বরণ অম্বরখানিনির্ম্মম করে খুলে দিল টানি,ভিখারী নারীর চীরবাস আনিদিল রাণীদেহে তুলিয়া।

পথে লয়ে তারে কহিলেন রাজা।‘মাগিবে দুয়ারে দুয়ারে;এক প্রহরের লীলায় তােমারযে ক’টি কুটীর হল ছারখারযতদিনে পার সে ক’টি আবারগড়ি দিতে হবে তােমারে।

বৎসর কাল দিলেম সময়।তার পরে ফিরে আসিয়াসভায় দাঁড়ায়ে করিয়া প্রণতিসবার সমুখে জানাবে যুবতীহয়েছে জগতে কতটুকু ক্ষতিজীর্ণ কুটীর নাশিয়া।