স্পর্শমণি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কথা

নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনেজপিছেন নাম।হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসেকরিল প্রণাম।

শুধালেন সনাতন, কোথা হতে আগমন,কী নাম ঠাকুর।বিপ্র কহে, কীবা কব পেয়েছি দর্শন তবভ্রমি’ বহুদূর।জীবন আমার নাম মানকরে মোর ধাম,জিলা বর্ধমানে,এত বড়ো ভাগ্যহত দীনহীন মোর মতোনাই কোনোখানে।জমিজমা আছে কিছু করে আছি মাথা নিচু,অল্প স্বল্প পাই।ক্রিয়াকর্ম যজ্ঞ যাগে বহু খ্যাতি ছিল আগেআজ কিছু নাই।আপন উন্নতি লাগি শিব কাছে বর মাগিকরি আরাধনা।—এক দিন নিশিভোরে স্বপ্নে দেব কহে মোরে—পূরিবে প্রার্থনা।যাও যমুনার তীর, সনাতন গোস্বামীরধরো দুটি পায়,তাঁরে পিতা বলি মেনো, তাঁরি হাতে আছে জেনোধনের উপায়।শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন্কী আছে আমার।

যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলিভিক্ষামাত্র সার।সহসা বিস্মৃতি ছুটে,— সাধু ফুকারিয়া উঠে—ঠিক বটে ঠিক।একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটেপরশ মানিক।যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানেপুঁতেছি বালুতে;নিয়ে যাও হে ঠাকুর দুঃখ তব হোক দূরছুঁতে নাহি ছুঁতে।বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশিপাইল সে মণি,লোহার মাদুলি দুটি সোনা হয়ে উঠে ফুটিছুঁইল যেমনি।ব্রাহ্মণ বালুর পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে—ভাবে নিজে নিজে।যমুনা কল্লোল গানে চিন্তিতের কানে কানেকহে কত কী যে।নদীপারে রক্তচ্ছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবিগেল অস্তাচলে—তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটেকহে অশ্রুজলে,—

যে-ধনে হইয়া ধনী মণিরে মানো না মণিতাহারি খানিকমাগি আমি নতশিরে। এত বলি নদীনীরেফেলিল মানিক।—