প্রতিনিধি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কাব্যগ্রন্থ — কথা ও কাহিনী

বসিয়া প্রভাতকালে সেতারার দুর্গভালেশিবাজি হেরিলা একদিন—রামদাস গুরু তাঁর ভিক্ষা মাগি দ্বার দ্বারফিরিছেন যেন অন্নহীন।ভাবিলা, —এ কি এ কাণ্ড, গুরুজির ভিক্ষাভাণ্ডঘরে যাঁর নাই দৈন্য লেশ?সবই যাঁর হস্তগত রাজ্যেশ্বর পদানততাঁরো নাই বাসনার শেষ?

এ কেবল দিনে রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রেবৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে;কহিলা, দেখিতে হবে কতখানি দিলে তবেভিক্ষা বুলি ভরে একেবারে।তখনি লেখনী আনি কি লিখি দিলা কি জানিবালাজিরে কহিলা ডাকায়েগুরু যবে ভিক্ষা আশে আসিবেন দুর্গ-পাশেএই লিপি দিয়ে তাঁর পায়ে।

গুরু চলেছেন গেয়ে, সম্মুখে চলেছে ধেয়েকত পান্থ, কত অশ্বরথ। —“হে ভবেশ, হে শঙ্কর, সবারে দিয়েছ ঘর,আমারে দিয়েছ শুধু পথ।অন্নপূর্ণা মা আমার লয়েছে বিশ্বের ভার,সুখে আছে সর্ব্ব চরাচর,মোরে তুমি হে ভিখারী মা’র কাছ হ’তে কাড়িকরেছ আপন অনুচর।”

সমাপন করি গান সারিয়া মধ্যাহ্নস্নানদুর্গদ্বারে আসিলা যখন—বালাজি নমিয়া তাঁরে দাঁড়াইল একধারেপদমূলে রাখিয়া লিখন।গুরু কৌতুহলভরে তুলিয়া লইলা করে,পড়িয়া দেখিলা পত্রখানিবন্দি তাঁর পাদপদ্ম শিবাজি সঁপিছে অদ্যতাঁরে নিজ রাজ্য-রাজধানী।

পর দিনে রামদাস গেলেন রাজার পাশ,কহিলেন, “পুত্র কহ শুনিরাজ্য যদি মোরে দেবে কি কাজে লাগিবে এবেকোন্ গুণ আছে তব, গুণী?”

“তােমারি দাসত্বে প্রাণ। আনন্দে করিব দান”শিবাজি কহিলা নমি তাঁরে,—গুরু কহে-“এই ঝুলি লহ তবে স্কন্ধে তুলিচল আজি ভিক্ষা করিবারে।”

শিবাজি গুরুর সাথে ভিক্ষাপাত্র ল’য়ে হাতেফিরিলেন পুরদ্বারে দ্বারে।নৃপে হেরি ছেলে মেয়ে ভয়ে ঘরে যায় ধেয়েডেকে আনে পিতারে মাতারে।অতুল ঐশ্বর্য্যে রত তাঁর ভিখারীর ব্রত,এ যে দেখি জলে ভাসে শিলা!ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে, হস্ত কাঁপে থরথরে,ভাবে, ইহা মহতের লীলা।

দুর্গে দ্বিপ্রহর বাজে, ক্ষান্ত দিয়া কর্ম্মকাজেবিশ্রাম করিছে পুরবাসী।একতারে দিয়ে তান রামদাস গাহে গানআনন্দনয়নজলে ভাসি;—“ওহে ত্রিভুবনপতি বুঝি না তােমার মতিকিছু ত অভাব তব নাহি,হৃদয়ে হৃদয়ে তবু ভিক্ষা মাগি ফির প্রভুসবার সর্ব্বস্বধন চাহি।”

অবশেষে দিবসান্তে নগরের একপ্রান্তেনদীকূলে সন্ধ্যাস্নান সারি—ভিক্ষা-অন্ন রাঁধি সুখে গুরু কিছু দিলা মুখেপ্রসাদ পাইল শিষ্য তাঁরি।রাজা তবে কহে হাসি “নৃপতির গর্ব্ব নাশিকরিয়াছ পথের ভিক্ষুক;প্রস্তুত রয়েছে দাস,— আরাে কিবা অভিলাষ,গুরু কাছে ল’ব গুরু দুখ।”

গুরু কহে “তবে শােন্, করিলি কঠিন পণঅনুরূপ নিতে হবে ভার,এই আমি দিনু ক'য়ে মাের নামে মাের হ'য়েরাজ্য তুমি লহ পুনর্ব্বার।তােমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি,রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন;পালিবে যে রাজধর্ম্ম জেনাে তাহা মাের কর্ম্ম,রাজ্য ল'য়ে র'বে রাজ্যহীন।—

“বৎস, তবে এই লহ মাের আশীর্ব্বাদসহআমার গেরুয়া গাত্রবাস;বৈরাগীর উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিয়াে”কহিলেন গুরু রামদাস।

নৃপশিষ্য নতশিরে বসি রহে নদীতীরে,চিন্তারাশি ঘনায় ললাটে।থামিল রাখাল-বেণু, গােঠে ফিরে গেল ধেনুপরপারে সূর্য্য গেল পাটে।

পূরবীতে ধরি তান একমনে রচি গানগাহিতে লাগিলা রামদাস,—“আমারে রাজার সাজে বসায়ে সংসার মাঝেকে তুমি আড়ালে কর বাস?হে রাজা রেখেছি আনি তােমারি পাদুকাখানিআমি থাকি পাদপীঠতলে;সন্ধ্যা হ'য়ে এল ওই, আর কত বসে' রইতব রাজ্যে তুমি এস চলে।”*