বিচারক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কাব্যগ্রন্থ — কথা ও কাহিনী

পুণ্য নগরে রঘুনাথ রাওপেশোয়া নৃপতি বংশ;—রাজাসনে উঠি কহিলেন বীর—হরণ করিব ভার পৃথিবীর,মৈসুরপতি হৈদরালিরদর্প করিব ধ্বংস।

দেখিতে দেখিতে পূরিয়া উঠিলসেনানী আশি সহস্র।নানা দিকে দিকে নানা পথে পথেমারাঠার যত গিরিদরী হ’তেবীরগণ যেন শ্রাবণের স্রোতেছুটিয়া আসে অজস্র।

উড়িল গগনে বিজয়পতাকাধ্বনিল শতেক শঙ্খ।হুলুরব করে অঙ্গন সবে,পুণ্য নগরী কাঁপিল গরবে,

রহিয়া রহিয়া প্রলয় আরবেবাজে ভৈরব ডঙ্ক।

ধূলার আড়ালে ধ্বজ-অরণ্যেলুকাল প্রভাত সূর্য্য।রক্ত অশ্বে রঘুনাথ চলে,আকাশ বধির জয়-কোলাহলে;সহসা যেন কি মন্ত্রের বলেথেমে গেল রণ-তূর্য্য।

সহসা কাহার চরণে ভূপতিজানাল পরম দৈন্য?সমরোন্মাদে ছুটিতে ছুটিতেসহসা নিমেষে কার ইঙ্গিতেসিংহদুয়ারে থামিল চকিতেআশি সহস্র সৈন্য?

ব্রাহ্মণ আসি দাঁড়াল সম্মুখেন্যায়াধীশ রামশাস্ত্রী।দুই বাহু তাঁর তুলিয়া উধাওকহিলেন ডাকি:—রঘুনাথ রাও

নগর ছাড়িয়া কোথা চলে’ যাওনা ল’য়ে পাপের শাস্তি?

নীরব হইল জয়-কোলাহল,নীরব সমর-বাদ্য।প্রভু কেন আজি-কহে রঘুনাথ,—অসময়ে পথ রুধিলে হঠাৎ,চলেছি করিতে যবন-নিপাতযোগাতে যমের খাদ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, বধিয়াছ তুমিআপন ভ্রাতার পুত্রে।বিচার তাহার না হয় য’দিনততকাল তুমি নহ ত স্বাধীন,বন্দী রয়েছ অমোঘ কঠিন,ন্যায়ের বিধান সূত্রে।

রুষিয়া উঠিলা রঘুনাথ রাও,কহিলা করিয়া হাস্য,—নৃপতি কাহারো বাঁধন না মানে,চলেছি দীপ্ত মুক্ত কৃপাণে,

শুনিতে আসিনি পথমাঝখানেন্যায় বিধানের ভাষ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, রঘুনাথ রাও,যাও কর গিয়ে যুদ্ধ।আমিও দণ্ড ছাড়িনু এবার,ফিরিয়া চলিনু গ্রামে আপনার,বিচারশালার খেলাঘরে আরনা রহিব অবরুদ্ধ।

বাজিল শঙ্খ, বাজিল ডঙ্ক,সেনানী ধাইল ক্ষিপ্র।ছাড়ি দিয়া গেলা গৌরবপদ,দূরে ফেলি দিয়া সব সম্পদগ্রামের কুটীরে চলি গেল ফিরেদীন দরিদ্র বিপ্র।