শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কাব্যগ্রন্থ — কথা ও কাহিনী

“প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি,ওগো পুরবাসী কে রয়েছ জাগি”,—অনাথ-পিণ্ডদ কহিলা অম্বুদ-নিনাদে।সদ্য মেলিতেছে তরুণ তপনআলস্যে অরুণ সহাস্য লোচনশ্রাবস্তিপুরীর গগন-লগন-প্রাসাদেবৈতালিকদল সুপ্তিতে শয়ান,এখনো ধরেনি মাঙ্গলিক গান,দ্বিধাভরে পিক মৃদু কুহুতানকুহরে।

ভিক্ষু কহে ডাকি—“হে নিদ্রিত পুর,দেহ ভিক্ষা মোরে, কর নিদ্রা দূর”—সুপ্ত পৌরজন শুনি সেই সুরশিহরে।সাধু কহে,—“শুন, মেঘ বরিষারনিজেরে নাশিয়া দেয় বৃষ্টিধার,সর্ব্ব ধর্ম্মমাঝে ত্যাগ ধর্ম্ম সারভুবনে।”কৈলাস শিখর হ’তে দূরাগতভৈরবের মহা-সঙ্গীতের মতসে বাণী মন্দ্রিল স্থখ তন্দ্রারতভবনে।রাজা জাগি ভাবে বৃথা রাজ্য ধন,গৃহী ভাবে মিছা তুচ্ছ আয়োজন,অশ্রু অকারণে করে বিসর্জনবালিকা।যে ললিত সুখে হৃদয় অধীরমনে হ’ল, তাহা গত যামিনীরস্খলিত দলিত শুষ্ক কামিনীরমালিকা।

বাতায়ন খুলে যায় ঘরে ঘরে,ঘুম-ভাঙা আঁখি ফুটে থরে থরেঅন্ধকার পথ কৌতুহল ভরেনেহারি’।“জাগ ভিক্ষা দাও!” সবে ডাকি ডাকি,সুপ্ত সৌধে তুলি নিদ্রাহীন আঁখি,শূন্য রাজবাটে চলেছে একাকীভিখারী।ফেলি দিল পথে বণিক-ধনিকামুঠি মুঠি তুলি রতন-কণিকা,কেহ কণ্ঠহার, মাথার মণিকাকেহ গো!ধনী স্বর্ণ আনে থালি পূরে পূরে,সাধু নাহি চাহে, পড়ে’ থাকে দূরে,ভিক্ষু কহে—“ভিক্ষা আমার প্রভুরেদেহ গো!”বসনে ভূষণে ঢাকি গেল ধূলি,কনকে রতনে খেলিল বিজুলী,সন্ন্যাসী ফুকারে ল’য়ে শূন্য ঝুলিসঘনে;–

“ওগো পৌরজন, কর অবধান,ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি, বুদ্ধ ভগবান,দেহ তাঁরে নিজ সর্ববশ্রেষ্ঠ দানযতনে ৷”ফিরে যায় রাজা, ফিরে যায় শেঠ,মিলে না প্রভুর যোগ্য কোনো ভেট,বিশাল নগরী লাজে রহে হেঁট-আননে।রৌদ্র উঠে ফুটে, জেগে উঠে দেশ,মহানগরীর পথ হ’ল শেষ,পুরপ্রান্তে সাধু করিলা প্রবেশকাননে;দীন নারী এক ভূতল-শয়ননা ছিল তাহার অশন ভূষণ,সে আসি নমিল সাধুর চরণ-কমলে।অরণ্য-আড়ালে রহি কোনোমতেএকমাত্র বাস নিল গাত্র হ’তে,বাহুটি বাড়ায়ে ফেলি দিল পথেভূতলে

ভিক্ষু উৰ্দ্ধভুজে করে জয়নাদ,কহে “ধন্য মাতঃ, করি আশীর্ব্বাদ,মহাভিক্ষুকের পূরাইলে সাধপলকে ৷”চলিলা সন্ন্যাসী ত্যজিয়া নগরছিন্ন চীরখানি ল’য়ে শিরোপর,সঁপিতে বুদ্ধের চরণ-নখর-আলোকে।{{smaller|৫ই কার্ত্তিক, ১৩১৪