মালিনী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কাব্যগ্রন্থ

ত্যাগ কর, বৎসে, ত্যাগ কর, সুখআশা,দুঃখভয়; দূর কর বিষয়-পিপাসা;ছিন্ন কর সংসারবন্ধন; পরিহরপ্রমোদপ্রলাপ চঞ্চলতা; চিত্তে ধরধ্রুবশান্ত সুনির্ম্মল প্রজ্ঞার আলোকরাত্রিদিন;–মোহশোক পরাভূত হোক।

মালিনী

ভগবন্ রুদ্ধ আমি, নাহি হেরি চোখে;সন্ধ্যায় মুদ্রিতদল পদ্মের কোরকে

আবদ্ধ ভ্রমরী,স্বর্ণরেণুরাশিমাঝেমৃত জড়প্রায়। তবু কানে এসে বাজেমুক্তির সঙ্গীত, তুমি কৃপা কর যবে।

কাশ্যপ

আশীর্বাদ করিলাম, অবসান হ'বেবিভাবরী, -জ্ঞানসূর্য-উদয়-উৎসবেজাগ্রত এ জগতের জয়জয়রবেশুভলগ্নে সুপ্রভাতে হবে উদঘাটনপুষ্পকারাগার তব। সেই মহাক্ষণএসেছে নিকটে। আমি তবে চলিলামতীর্থ পর্য্যটনে।

মালিনী

লহ দাসীর প্রণাম।

(কাশ্যপের প্রস্থান)

মহাক্ষণ আসিয়াছে! অন্তর চঞ্চলযেন বারিবিন্দুসম করে টলমলপদ্মদলে। নেত্র মুদি' শুনিতেছি কানেআকাশের কোলাহল; কাহারা কে জানেকি করিছে আয়ােজন আমারে ঘিরিয়া,আসিতেছে যাইতেছে ফিরিয়া ফিরিয়াঅদৃশ্য মুরতি। কভু বিদ্যুতের মতচমকিছে আলাে; বায়ুর তরঙ্গ যত

শব্দ করি’ করিছে আঘাত। ব্যথাসমকি যেন বাজিছে আজি অন্তরেতে মমবারম্বার—কিছু আমি নারি বুঝিবারেজগতে কাহারা আজি ডাকিছে আমারে।

রাজমহিষীর প্রবেশ

মহিষী

মা গাে মা, কি করি তােরে ল’য়ে! ওরে বাছা,এ সব কি সাজে তােরে কভু, এই কাঁচানবীন বয়সে? কোথা গেল বেশভূষাকোথা আভরণ? আমার সােনার ঊষাস্বর্ণপ্রভাহীনা; এও কি চোখের পরেসহ্য হয় মার?

মালিনী

কখনাে রাজার ঘরেজন্মে না কি ভিখারিণী? দরিদ্রের কুলেতুই যে মা জন্মেছিস্ সে কি গেলি ভুলেরাজেশ্বরী? তাের সে বাপের দরিদ্রতাজগৎবিখ্যাত, বল্ মা সে যাবে কোথা?তাই আমি ধরিয়াছি অলঙ্কারসমতমার বাপের দৈন্য সর্ব্বঅঙ্গে মমমা আমার।

মহিষী

ও গাে, আপন বাপের গর্ব্বেআমার বাপেরে দাও খোঁটা? তাই গর্ভেধরেছিনু তােরে, ওরে অহঙ্কারী মেয়ে?জানিস, আমার পিতা তাের পিতাচেয়েশতগুণে ধনী, তাই ধনরত্ন পানেএত তাঁর হেলা!

মালিনী

সে ত সকলেই জানে।যেদিন পিতৃব্য তব, পিতৃধনলােভেবঞ্চিলেন পিতারে তােমার, মনক্ষোভেছাড়িলেন গৃহ তিনি। সর্ব্ব ধনজনসম্পদসহায় করিলেন বিসর্জ্জনঅকাতর মনে; শুধু সযত্নে আনিলাপৈতৃক দেবতামূর্ত্তি, শালগ্রাম শিলা,দরিদ্রকুটীরে। সেই তাঁর ধর্ম্মখানিমাের জন্মকালে মােরে দিয়েছ মা আনি’আর কিছু নহে। থাক্ না মা সর্ব্বক্ষণতব পিতৃভবনের দরিদ্রের ধনতােমারি কন্যার হৃদে। আমার পিতারযা কিছু ঐশ্বর্য আছে ধনরত্নভারথাক্‌ রাজপুত্র তরে।

মহিষী

কে তােমারে বােঝেমা আমার। কথা শুনে জানি না কেন যেচক্ষে আসে জল। যেদিন আসিলি কোলেবাক্যহীন মূঢ় শিশু, ক্রন্দনকল্লোলেমায়েরে ব্যাকুল করি, কে জানিত তবেসেই ক্ষুদ্র মুগ্ধ মুখ এত কথা ক'বেদুই দিন পরে! থাকি তাের মুখ চেয়ে,ভয়ে কাঁপে বুক। ও মোর সোনার মেয়েএ ধর্ম্ম কোথায় পেলি, কি শাস্ত্রবচন?আমার পিতার ধর্ম্ম সে ত পুরাতনঅনাদি কালের। কিন্তু মাগাে, এ যে তবসৃষ্টিছাড়া বেদছাড়া ধর্ম্ম অভিনবআজিকার গড়া। কোথা হ'তে ঘরে আসেবিধর্ম্মী সন্ন্যাসী? দেখে' আমি মরি ত্রাসে।কি মন্ত্র শিখায় তা'রা, সরল হৃদয়জড়ায় মিথ্যার জালে? লােকে না কি কয়বৌদ্ধেরা পিশাচপন্থী, যাদুবিদ্যা জানে,প্রেতসিদ্ধ তা'রা। মাের কথা লহ কানেবাছারে আমার। -ধর্ম্ম কি খুঁজিতে হয়?সূর্যের মতন ধর্ম্ম চিরজ্যোতির্ম্ময়

চিরকাল আছে। ধর তুমি সেই ধর্ম্ম,সরল সে পথ। লহ ব্রতক্রিয়াকর্ম্মভক্তিভরে। শিবপূজা কর দিনযামী,বর মাগি' লহ বাছা তাঁরি মত স্বামী।সেই পতি হবে তাের সমস্ত দেবতা,শাস্ত্র হবে তাঁরি বাক্য, সরল এ কথা।শাস্ত্রজ্ঞানী পণ্ডিতেরা মরুক ভাবিয়াসত্যাসত্য ধর্ম্মাধর্ম্ম কর্ত্তাকর্ম্মক্রিয়াঅনুস্বর চন্দ্রবিন্দু ল'য়ে! পুরুষেরদেশভেদে কালভেদে প্রতিদিবসেরস্বতন্ত্র নূতন ধর্ম্ম; সদা হাহা করে’ফিরে তা'রা শান্তি লাগি’ সন্দেহ-সাগরে,শাস্ত্র ল’য়ে করে কাটাকাটি। রমণীরধর্ম্ম থাকে বক্ষে কোলে চিরদিন স্থিরপতিপুত্ররূপে!

রাজার প্রবেশ

রাজা

কন্যা, ক্ষান্ত হও এবে,কিছুদিনতরে। উপরে আসিছে নেবেঝটিকার মেঘ।

মহিষী

কোথা হ'তে মিথ্যা ভয়আনিয়াছ মহারাজ?

রাজা

বড় মিথ্যা নয়।হায়রে অবােধ মেয়ে, নবধর্ম্ম যদিঘরেতে আনিতে চাস্, সে কি বর্ষানদীএকেবারে তট ভেঙে হইবে প্রকাশদেশবিদেশের দৃষ্টিপথে? লজ্জাত্রাসনাহি তা’র? আপনার ধর্ম্ম আপনারি,থাকে যেন সঙ্গোপনে, সর্ব্বনরনারীদেখে' যেন নাহি করে দ্বেষ, পরিহাসনা করে কঠোর। ধর্ম্মেরে রাখিতে চাসরাখ মনেমনে।

মহিষী

ভর্তসনা করিছ কেনবাছারে আমার মহারাজ? কত যেনঅপরাধী। কি শিক্ষা শিখাতে এলে আজরাজনীতিকুটিলতা? লুকায়ে করিবে কাজ,ধর্ম্ম দিবে চাপা! সে মেয়ে আমার নয়।সাধু সন্ন্যাসীর কাছে উপদেশ লয়,

শুনে পুণ্যকথা, করে সজ্জনের সেবা,আমি ত বুঝি না তাহে দোষ দিবে কেবা,ভয় বা কাহারে!

রাজা

মহারাণী, প্রজাগণক্ষুব্ধ অতিশয়। চাহে তা'রা নির্বাসনমালিনীর?

মহিষী

কি বলিলে! নির্ব্বাসন কারে!মালিনীরে? মহারাজ, তােমার কন্যারে?

রাজা

ধর্ম্মনাশ আশঙ্কায় ব্রাহ্মণের দলএক হ'য়ে—

মহিষী

ধর্ম্ম জানে ব্রাহ্মণে কেবল?আর ধর্ম নাই? তাদেরি পুঁথিতে লেখাসর্ব্ব সত্য, অন্য কোথা নাহি তা’র রেখাএ বিশ্বসংসারে? ব্রাহ্মণেরা কোথা আছে।ডেকে নিয়ে এস। আমার মেয়ের কাছেশিখে নি ধর্ম্ম কারে বলে। ফেলে দিককীটে কাটা ধর্ম্ম তা’র ধিক্‌, ধিক্ ধিক্!

ওরে বাছা, আমি লব নবমন্ত্র তাের,আমি ছিন্ন করে' দেব’ জীর্ণ শাস্ত্রডােরব্রাহ্মণের। তােমারে পাঠাবে নির্ব্বাসনে?নিশ্চিন্ত রয়েছ মহারাজ? ভাব মনেএ কন্যা তোমার কন্যা, সামান্য বালিকা,ওগাে তাহা নহে। এ যে দীপ্ত অগ্নিশিখা।আমি কহিলাম আজি শুনি লহ কথা—এ কন্যা মানবী নহে, এ কোন্ দেবতা,এসেছে তােমার ঘরে। করিয়াে না হেলা,কোন দিন অকস্মাৎ ভেঙে দিয়ে খেলাচলে যাবে-তখন করিবে হাহাকার-রাজ্যধন সব দিয়ে পাইবে না আর।

মালিনী

প্রজাদের পূরাও প্রার্থনা। মহাক্ষণএসেছে নিকটে। দাও মােরে নির্ব্বাসনপিতা।

রাজা

কেন বৎসে, পিতার ভবনে তােরকি অভাব? বাহিরের সংসার কঠোরদয়াহীন, সে কি বাছা পিতৃমাতৃক্রোড়?

মালিনী

শােন পিতা,—যারা চাহে নির্ব্বাসন মােরতা'রা চাহে মােরে। ওগাে মা, শােন্ মা কথা!বােঝাতে পারিনে মোর চিত্তব্যাকুলতা।আমারে ছাড়িয়া দে মা বিনা দুঃখশােকে,শাখা হ’তে চ্যুতপত্রসম। সর্ব্বলােকেযাব আমি -রাজদ্বারে মােরে যাচিয়াছেবাহির সংসার। জানি না কি কাজ আছে,আসিয়াছে মহাক্ষণ।

রাজা

ওরে শিশুমতিকি কথা বলিস্!

মালিনী

পিতা, তুমি নরপতি,রাজার কর্ত্তব্য কর। জননী আমার,আছে তাের পুত্রকন্যা, এ ঘরসংসার,আমারে ছাড়িয়া দে মা। বাঁধিসনে আরস্নেহপাশে।

মহিষী

শােন কথা শােন একবার।বাক্য নাহি সরে মুখে, চেয়ে তাের পানেরয়েছি বিস্মিত। হাঁ গাে, জন্মিলি যেখানে

সেখানে কি স্থান নাই তাের? মা আমার,তুই কি জগৎলক্ষী, জগতের ভারপড়েছে কি তােরি পরে? নিখিল সংসারতুই বিনা মাতৃহীনা, যাবি তারি কাছেনূতন আদরে;—আমাদের মা কে আছেতুই চলে' গেলে?

মালিনী

আমি স্বপ্ন দেখি জেগে,শুনি নিদ্রাঘােরে, যেন বায়ু বহে বেগে,নদীতে উঠিছে ঢেউ, রাত্রি অন্ধকার,নৌকাখানি তীরে বাঁধা—কে করিবে পার,কর্ণধার নাই-গৃহহীন যাত্রী সবেবসে' আছে নিরাশ্বাস—মনে হয় তবেআমি যেন যেতে পারি—আমি যেন জানিতীরের সন্ধান-মাের স্পর্শে নৌকাখানিপাবে যেন প্রাণ—যাবে যেন আপনারপূর্ণ বলে;—কোথা হ'তে বিশ্বাস আমারএল মনে? রাজকন্যা আমি,—দেখি নাইবাহির সংসার—বসে' আছি এক ঠাইজন্মাবধি, চতুর্দ্দিকে সুখের প্রাচীর,আমারে কে করে' দেয় ঘরের বাহির

কে জানে গাে। বন্ধ কেটে দাও মহারাজ,ওগাে ছেড়ে দে মা, কন্যা আমি নহি আজ,নহি রাজসুতা,—যে মাের অন্তরযামীঅগ্নিময়ী মহাবাণী, সেই শুধু আমি।

মহিষী

শুনিলে ত মহারাজ? এ কথা কাহার?শুনিয়া বুঝিতে নারি! এ কি বালিকার?এই কি তােমার কন্যা? আমি কি আপনিইহারে ধরেছি গর্ভে?

রাজা

যেমন রজনীউষারে জনম দেয়। কন্যা জ্যোতির্ম্ময়ীরজনীর কেহ নহে, সে যে বিশ্বজয়ীবিশ্বে দেয় প্রাণ।

মহিষী

মহারাজ তাই বলি,খুঁজে দেখ কোথা আছে মায়ার শিকলিযাহে বাঁধা পড়ে' যায় আলোকপ্রতিমা।

( কন্যার প্রতি)

মুখে খুলে পড়ে কেশ, একি বেশ! ছি মা!আপনারে এত অনাদর। আয় দেখিভালাে করে বেঁধে দিই। লােকে বলিবে কি

দেখে তােরে?—নির্ব্বাসন! এই যদি হয়ধর্ম্ম ব্রাহ্মণের—তবে হােক মা উদয়নব ধর্ম্ম-শিখে নিক তােরি কাছ হ'তেবিপ্রগণ। দেখি মুখ, আয় মা আলােতে।

( মহিষী ও মালিনীর প্রস্থান)

সেনাপতির প্রবেশ

সেনাপতি

মহারাজ, বিদ্রোহী হয়েছে প্রজাগণব্রাহ্মণবচনে! তা'রা চায় নির্ব্বাসনরাজকুমারীর।

রাজা

যাও তবে সেনাপতিসামন্তনৃপতি সবে আন দ্রুতগতি।

ব্রাহ্মণগণ

নির্ব্বাসন, নির্ব্বাসন, রাজ-দুহিতারনির্ব্বাসন।

ক্ষেমঙ্কর

বিপ্রগণ, এই কথা সার।এ সংকল্প দৃঢ় রেখাে মনে। জেনাে ভাইঅন্য অরি নাহি ডরি নারীরে ডরাই।তা'র কাছে অস্ত্র যায় টুটে; পরাহততর্কযুক্তি, বাহুবল করে শির নত—নিরাপদে হৃদয়ের মাঝে করে বাসরাজ্ঞীসম মনােহর মহাসর্ব্বনাশ।

চারুদত্ত

চল সবে রাজদ্বারে, বল, “রক্ষ রক্ষমহারাজ, আর্য্যধর্ম্মে করিতেছে লক্ষ্যতব নীড় হ’তে সর্প।”

সুপ্রিয়

ধর্ম্ম? মহাশয়,মূঢ়ে উপদেশ দেহ ধর্ম্ম কারে কয়।ধর্ম্ম নির্দ্দোষীর নির্ব্বাসন?

চারুদত্ত

তুমি দেখিকুলশত্রু বিভীষণ। সকল কাজে কিবাধা দিতে আছ?

সােমাচার্য্য

মােরা ব্রাহ্মণ-সমাজেএকত্রে মিলেছি সবে ধর্ম্মরক্ষাকাজে;তুমি কোথা হ'তে এসে মাঝে দিলে দেখাঅতিশয় সুনিপুণ বিচ্ছেদের রেখা,সূক্ষম সর্ব্বনাশ।

সুপ্রিয়

ধর্ম্মাধর্ম সত্যাসত্যকে করে বিচার! আপন বিশ্বাসে মত্তকরিয়াছ স্থির, শুধু দল বেঁধে সবেসত্যের মীমাংসা হবে, শুধু উচ্চরবে?যুক্তি কিছু নহে?

চারুদত্ত

দস্ত তব অতিশয়হে সুপ্রিয়।

সুপ্রিয়

প্রিয়ম্বদ, মাের দম্ভ নয়;—আমি অজ্ঞ অতি-দম্ভ তারি যে আজিকেশতার্থক শাস্ত্র হ’তে দুটো কথা শিখেনিস্পাপ নিরপরাধ রাজকুমারীরেটানিয়া আনিতে চাহে ঘরের বাহিরেভিক্ষুকের পথে,—তাঁর শাস্ত্রে মাের শাস্ত্রেদু অক্ষর প্রভেদ বলিয়া।

ক্ষেমঙ্কর

বচনাস্ত্রেকে পারে তােমারে বন্ধুবর!

সােমাচার্য্য

দূর করে'দাও সুপ্রিয়েরে। বিপ্রগণ কর ওরেসভার বাহির।

চারুদত্ত

মােরা নির্ব্বাসন চাহিরাজকুমারীর। যার অভিমত নাহিযাক সে বাহিরে।

ক্ষেমঙ্কর

ক্ষান্ত হও বন্ধুগণ।

সুপ্রিয়

ভ্রমক্রমে আমারে করেছে নির্ব্বাচনব্রাহ্মণমণ্ডলী। আমি নহি একজনতােমাদের ছায়া। প্রতিধ্বনি নহি আমিশাস্ত্রবচনের। যে শাস্ত্রের অনুগামীএ ব্রাহ্মণ, সে শাস্ত্রে কোথাও লেখে নাইশক্তি যার ধর্ম্ম তা'র।(ক্ষেমঙ্করের প্রতি) চলিলাম ভাই!আমারে বিদায় দাও।

ক্ষেমঙ্কর

দিব না বিদায়।তর্কে শুধু দ্বিধা তব, কাজের বেলায়দৃঢ় তুমি পর্বতের মত। বন্ধু মাের,জান না কি আসিয়াছে দুঃসময় ঘাের,আজ মৌন থাক।

সুপ্রিয়

বন্ধু, জন্মেছে ধিক্কার।মূঢ়তার দুর্ব্বিনয় নাহি সহে আর।যাগযজ্ঞ ক্রিয়াকর্ম্ম ব্রত উপবাসএই শুধু ধর্ম্ম বলে’ করিবে বিশ্বাসনিঃসংশয়ে? বালিকারে দিয়া নির্ব্বাসনেসেই ধর্ম্ম রক্ষা হবে? ভেবে দেখ মনেমিথ্যারে সে সত্য বলি করেনি প্রচার,—সেও বলে সত্য ধর্ম্ম, দয়া ধর্ম্ম তা'র,সর্ব্বজীবে প্রেম;—সর্ব্বধর্ম্মে সেই সার,—তা’র বেশি যাহা আছে, প্রমাণ কি তা'র!

ক্ষেমঙ্কর

স্থির হও ভাই। মূল ধর্ম্ম এক বটে,বিভিন্ন আধার। জল এক, ভিন্ন তটেভিন্ন জলাশয়। আমরা যে সরােবরেমিটাই পিপাসা পিতৃপিতামহ ধরে’সেথা যদি অকস্মাৎ নবজলােচ্ছ্বাসবন্যার মত আসে, ভেঙে করে নাশতটভূমি তার,—সে উচ্ছ্বাস হ'লে গতবাঁধ-ভাঙা সরােবরে জলরাশি যত

বাহির হইয়া যাবে। তোমার অন্তরেউৎস আছে, প্রয়ােজন নাহি সরােবরে,—তাই বলে' ভাগ্যহীন সর্ব্বজনতরেসাধারণ জলাশয় রাখিবে না তুমি,—পৈতৃককালের বাঁধা দৃঢ় তটভূমি,বহুদিবসের প্রেমে সতত লালিতসৌন্দর্য্যের শ্যামলতা, সযত্নপালিতপুরাতন ছায়াতরুগুলি, পিতৃধর্ম্ম,প্রাণপ্রিয় প্রথা, চির-আচরিত কর্ম্ম,চিরপরিচিত নীতি? হারায়ে চেতনসত্য জননীর কোলে নিদ্রায় মগনকত মূঢ় শিশু, নাহি জানে জননীরে,—তাদের চেতনা দিতে মাতার শরীরেকোরাে না আঘাত। ধৈর্য্য সদা রাখ, সখে,ক্ষমা কর ক্ষমাযােগ্য জনে, জ্ঞানালােকেআপন কর্ত্তব্য কর।

সুপ্রিয়

তব পথগামীচিরদিন এ অধীন। রেখে দিব আমিতব বাক্য শিরে করি'। তর্ক-সূচি পরেসংসারকর্ত্তব্যভার কভু নাহি ধরে।

উগ্রসেনের প্রবেশ

উগ্রসেন

কার্য্য সিদ্ধ ক্ষেমঙ্কর! হয়েছে চঞ্চলব্রাহ্মণের বাক্য শুনে রাজসৈন্যদল,আজি বাঁধ ভাঙে-ভাঙে!

সােমাচার্য্য

সৈন্যদল!

চারুদত্ত

সে কি!একি কাণ্ড, ক্রমে এযে বিপরীত দেখিবিদ্রোহের মত!

সােমাচার্য্য

এতদূর ভালাে নয়ক্ষেমঙ্কর।

চারুদত্ত

ধর্ম্মবলে ব্রাহ্মণের জয়,বাহুবলে নহে। যজ্ঞযাগে সিদ্ধি হবে;দ্বিগুণ উৎসাহভরে এস বন্ধু সবেকরি মন্ত্র পাঠ। শুদ্ধাচারে যােগাসনেব্রহ্মতেজ করি উপার্জ্জন। একমনেপৃজি ইষ্টদেবে।

সােমাচার্য্য

তুমি কোথা আছ দেবি,সিদ্ধিদাত্রী জগদ্ধাত্রী! তব পদ সেবি’ব্যর্থকাম কভু নাহি হবে ভক্তজন।তুমি কর নাস্তিকের দর্পসংহরণ,সশরীরে প্রত্যক্ষ দেখায়ে দাও আজিবিশ্বাসের বল। সংহারের বেশে সাজি’এখনি দাঁড়াও সর্ব্বসম্মুখেতে আসিমুক্তকেশে খড়গহস্তে, অট্টহাস হাসি’পাষণ্ডদলনী। এস সবে একপ্রাণভক্তিভরে সমস্বরে করহ আহবানপ্রলয়শক্তিরে।

ব্রাহ্মণগণ

(সমস্বরে) সবে করযােড়ে যাচি-আয় মা প্রলয়ঙ্করী।

মালিনীর প্রবেশ

মালিনী

আমি আসিয়াছি।(ক্ষেমঙ্কর ও সুপ্রিয় ব্যতীত সমস্ত ব্রাহ্মণেরভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম)

সােমাচার্য্য

এ কি দেবী, এ কি বেশ? দয়াময়ী এ যেএসেছেন ম্লানবস্ত্রে নরকন্যা সেজে।এ কি অপরূপ রূপ। এ কি স্নেহজ্যোতিনেত্রযুগে? এ ত নহে সংহারমূরতি!কোথা হ'তে এলে মাতঃ? কি ভাবিয়া মনে,কি করিতে কাজ?

মালিনী

আসিয়াছি নির্ব্বাসনে,তােমরা ডেকেছ বলে’ ওগাে বিপ্রগণ।

সােমাচার্য্য

নির্ব্বাসন! স্বর্গ হ'তে দেব-নির্ব্বাসনভক্তের আহ্বানে!

চারুদত্ত

হায়, কি করিব মাতঃ!তােমার সহায় বিনা আর রহে না তএ ভ্রষ্ট সংসার!

মালিনী

আমি ফিরিব না আর।জানিতাম, জানিতাম তােমাদের দ্বারমুক্ত আছে মাের তরে। আমারি লাগিয়াআছ বসে’ তাই আমি উঠেছি জাগিয়া

সুখসম্পদের মাঝে, তােমরা যখনসবে মিলি যাচিলে আমার নির্ব্বাসনরাজদ্বারে।

ক্ষেমঙ্কর

রাজকন্যা?

সকলে

রাজার দুহিতা!

সুপ্রিয়

ধন্য ধন্য!

মালিনী

আমারে করেছ নির্ব্বাসিতা?তাই আজি মাের গৃহ তােমাদের ঘরে।তবু একবার মােরে বল সত্য করে’সত্যই কি আছে কোনাে প্রয়ােজন মােরে,চাহ কি আমায়? সত্যই কি নাম ধরে’বাহিরসংসার হ'তে ডেকেছিলে সবেআপন নির্জ্জনঘরে বসে ছিনু যবেসমস্ত জগৎ হ’তে অতিশয় দূরেশতভিত্তিঅন্তরালে রাজঅন্তঃপুরেএকাকী বালিকা। তবে সে ত স্বপ্ন নয়!তাই ত কাঁদিয়াছিল আমার হৃদয়না বুঝিয়া কিছু!

চারুদত্ত

এস মা জননী,শত চিত্তশতদলে দাঁড়াও অমনিকরুণামাখানাে মুখে।

মালিনী

আসিয়াছি আজ-প্রথমে শিখাও মােরে কি করিব কাজতােমাদের। জন্ম লভিয়াছি রাজকুলে,রাজকন্যা আমি,—কখনাে গবাক্ষ খুলেচাহিনি বাহিরে; দেখি নাই এ সংসারবৃহৎ বিপুল,—কোথায় কি ব্যথা তা'রজানি না ত কিছু। শুনিয়াছি দুঃখময়বসুন্ধরা, সে দুঃখের লব পরিচয়তােমাদের সাথে।

দেবদত্ত

ভাসি নয়নের জলেমা তােমার কথা শুনে।

সকলে

আমরা সকলেপাষণ্ড পামর।

মালিনী

আজি মাের মনে হয়অমৃতের পাত্র যেন আমার হৃদয়—যেন সে মিটাতে পারে এ বিশ্বের ক্ষুধাযত দুঃখ যেথা আছে সকলের পরেঅনন্ত প্রবাহে।–দেখ দেখ নীলাম্বরেমেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ পেয়েছে প্রকাশ।কি বৃহৎ লােকালয়—কি শান্ত আকাশ-একজ্যোৎস্না বিস্তারিয়া সমস্ত জগৎকে নিল কুড়ায়ে বক্ষে —ওই রাজপথ,ওই গৃহশ্রেণী, ওই উদার মন্দির-স্তব্ধচ্ছায়া তরুরাজি—দূরে নদীতীর,বাজিছে পূজার ঘণ্টা—আশ্চর্য্য পুলকেপূরিছে আমার অঙ্গ— -জল আসে চোখে,কোথা হ'তে এমু আমি আজি জ্যোৎস্নালােকেতােমাদের এ বিস্তীর্ণ সর্বজনলােকে।

চারুদত্ত

তুমি বিশ্বদেবী।

সােমাচার্য্য

ধিক্ পাপ রসনায়!শত ভাগে ফাটিয়া গেল না বেদনায়,—চাহিল তােমার নির্ব্বাসন!

দেবদত্ত

চল সবেবিপ্রগণ, জননীরে জয়জয়রবেরেখে আসি রাজগৃহে।

সমবেত কণ্ঠে

জয় জননীর।জয় মা লক্ষীর! জয় করুণাময়ীর!

(মালিনীকে ঘিরিয়া লইয়া সুপ্রিয় ক্ষেমঙ্কর ব্যতীত সকলের প্রস্থান)

ক্ষেমঙ্কর

দূর হােক্ মােহ, দূর হােক! কোথা যাওহে সুপ্রিয়?

সুপ্রিয়

ছেড়ে দাও, মােরে ছেড়ে দাও।

ক্ষেমঙ্কর

স্থির হও। তুমি ও কি, বন্ধু, অন্ধভাবেজনস্রোতে সর্ব্বসাথে ভেসে চলে' যাবে?

সুপ্রিয়

এ কি স্বপ্ন ক্ষেমঙ্কর?

ক্ষেমঙ্কর

স্বপ্নে মগ্ন ছিলেএতক্ষণ,—এখন সবলে চক্ষু মিলেজেগে চেয়ে দেখ।

সুপ্রিয়

মিথ্যা তব স্বর্গধাম,মিথ্যা দেবদেবী ক্ষেমঙ্কর-ভ্রমিলামবৃথা এ সংসারে এতকাল। পাই নাইকোনাে তৃপ্তি কোনাে শাস্ত্রে, অন্তর সদাইকেঁদেছে সংশয়ে। আজ আমি লভিয়াছিধর্ম্ম মাের, হৃদয়ের বড় কাছাকাছি।সবার দেবতা তব, শাস্ত্রের দেবতা,আমার দেবতা নহে। প্রাণ তা'র কোথা,আমার অন্তরমাঝে কই কহে কথা,কি প্রশ্নের দেয় সে উত্তর–কি ব্যথারদেয় সে সান্ত্বনা! আজি, তুমি কে আমারজীবন-তরণীপরে রাখিলে চরণসমস্ত জড়তা তা'র করিয়া হরণএ কি গতি দিলে তা'রে! এতদিনপরেএ মর্ত্যধরণীমাঝে মানবের ঘরেপেয়েছি দেবতা মাের।

ক্ষেমঙ্কর

হায় হায় সখে,আপন হৃদয় যবে ভুলায় কুহকেআপনারে, বড় ভয়ঙ্কর সে সময়-শাস্ত্র হয় ইচ্ছা আপনার, ধর্ম্ম হয়

আপন কল্পনা। এই জ্যোৎস্নাময়ী নিশিসে সৌন্দর্য্যে দিকে দিকে রহিয়াছে মিশিইহাই কি চিরস্থায়ী? কাল প্রাতঃকালেশতলক্ষ ক্ষুধাগুলা শত কর্ম্মজালেঘিরিবে না ভবসিন্ধু—মহাকোলাহলেহবে না কঠিন রণ বিশ্বরণস্থলে?তখন এ জ্যোৎস্নাসুপ্তি স্বপ্নময়া বলে'মনে হ'বে—অতি ক্ষীণ, অতি ছায়াময়।যে সৌন্দর্য্যমোহ তব ঘিরেছে হৃদয়,সেও সেই জ্যোৎস্নাসম-ধর্ম্ম বল তা'রে?একবার চক্ষু মেলি চাও চারিধারেকত দুঃখ, কত দৈন্য, বিকট নিরাশা!ওই ধর্ম্মে মিটাইবে মধ্যাহ্নপিপাসাতৃষ্ণাতুর জগতের? সংসারের মাঝেওই তব ক্ষীণ মােহ লাগিবে কি কাজে?খররৌদ্রে দাঁড়াইয়া রণরঙ্গভূমেতখনাে কি মগ্ন হ'য়ে র’বে এই ঘুমেভুলে র’বে স্বপ্নধর্ম্মে-আর কিছু নাহি?নহে সখে।

সুপ্রিয়

নহে নহে।

ক্ষেমঙ্কর

তবে দেখ চাহিসম্মুখে তােমার। বন্ধু, আর রক্ষা নাই।এবার লাগিল অগ্নি। পুড়ে হবে ছাইপুরাতন অট্টালিকা, উন্নত উদার,সমস্ত ভারতখণ্ড কক্ষে কক্ষে যারহয়েছে মানুষ। এখনাে যে দুনয়নেস্বপ্ন লেগে আছে তব।

খাণ্ডবদহনেসমস্ত বিহঙ্গকুল গগনে গগনেউড়িয়া ফিরিয়াছিল করুণ ক্রন্দনেস্বর্গ সমাচ্ছন্ন করি' -বক্ষে রক্ষণীয়অক্ষম শাবকগণে স্মরি। হে সুপ্রিয়,সেই মত উদ্বেগ-অধীর পিতৃকুলনানা স্বর্গ হ'তে আসি’ আশঙ্কা-ব্যাকুলফিরিছেন শূন্যে শূন্যে আর্ত্ত কলস্বরেআসন্ন সঙ্কটাতুর ভারতের পরে।তবু স্বপ্নে মগ্ন সখে।

দেখ মনে স্মরি,আর্য্যধর্ম্ম মহাদুর্গ এ তীর্থনগরীপুণ্যকাশী। দ্বারে হেথা কে আছে প্রহরী?

সে কি আজ স্বপ্নে র'বে কর্ত্তব্য পাশরিশত্রু যবে সমাগত, রাত্রি অন্ধকার,মিত্র যবে গৃহদ্রোহী, পৌর পরিবারনিশ্চেতন।—হে সুপ্রিয়, তুলে চাও আঁখি।কথা কও। বল তুমি, আমারে একাকীফেলিয়া কি চলে' যাবে মায়ার পশ্চাতেবিশ্বব্যাপী এ দুর্য্যোগে, প্রলয়ের রাতে?

সুপ্রিয়

কভু নহে, কভু নহে। নিদ্রাহীন চোখেদাঁড়াইব পার্শ্বে তব।

ক্ষেমঙ্কর

শুন তবে, সখে,আমি চলিলাম।

সুপ্রিয়

কোথা যাবে?

ক্ষেমঙ্কর

দেশান্তরে,হেথা কোনাে আশা নাহি আর। ঘরে পরেব্যাপ্ত হ'য়ে গেছে বহ্নি। বাহির হইতেরক্তস্রোত মুক্ত করি হবে নিবাইতে।যাই, সৈন্য আনি।

সুপ্রিয়

হেথাকার সৈন্যগণরয়েছে প্রস্তুত।

ক্ষেমঙ্কর

মিথ্যা আশা; এতক্ষণমুগ্ধ পঙ্গপালসম তা'রাও সকলেদগ্ধপক্ষ পড়িয়াছে সব দলেবলেহুতাশনে। জয়ধ্বনি ওই শুনা যায়।উন্মত্তা নগরী আজ ধর্ম্মের চিতায়জ্বালায় উৎসবদীপ।

সুপ্রিয়

যদি যাবে ভাই,প্রবাসে কঠিনপণে, আমি সঙ্গে যাই।

ক্ষেমঙ্কর

তুমি কোথা যাবে বন্ধু? তুমি হেথা থেকোসদা সাবধানে; সকল সংবাদ রেখােরাজভবনের। লিখাে পত্র। দেখাে সখে,তুমিও ভুলাে না শেষে নূতন কুহকে,ছেড়াে না আমায়। মনে রেখাে সর্ব্বক্ষণপ্রবাসী বন্ধুরে।

সুপ্রিয়

সখে, কুহক নূতন,আমি ত নূতন নহি। তুমি পুরাতন,আর আমি পুরাতন।

ক্ষেমঙ্কর

দাও আলিঙ্গন।

সুপ্রিয়

প্রথম বিচ্ছেদ আজি। ছিনু চিরদিনএক সাথে। বক্ষে বক্ষে বিরহবিহীনচলেছিনু দোঁহে-আজ তুমি কোথা যাবে,আমি কোথা র’ব!

ক্ষেমঙ্কর

আবার ফিরিয়া পাবেবন্ধুরে তােমার। শুধু মনে ভয় হয়আজি বিপ্লবের দিন বড় দুঃসময়;—ছিন্নভিন্ন হ'য়ে যায় ধ্রুববন্ধচয়,ভ্রাতারে আঘাত করে’ ভ্রাতা, বন্ধু হয়বন্ধুর বিরােধী। বাহিরিনু অন্ধকারে,অন্ধকারে ফিরিয়া আসিব গৃহদ্বারে;দেখিব কি দীপ জ্বালি বসি’ আছ ঘরেবন্ধু মাের? সেই আশা রহিল অন্তরে।

অন্তঃপুরে মহিষী

মহিষী

এখানেও নাই! মাগাে, কি হবে আমার।কেবলি এমনি করে' কতদিন আরচোখে চোখে রাখি তা'রে, ভয়ে ভয়ে থাকি,রজনীতে ঘুম ভেঙে নাম ধরে' ডাকি,জেগে জেগে উঠি। চোখের আড়াল হ'লেমনে শঙ্কা হয় কোথা গেল বুঝি চলে'আমার সে স্বপ্নস্বরূপিণী। যাই, খুজি,কোথা সে লুকায়ে আছে।

(প্রস্থান)

যুবরাজের সহিত রাজার প্রবেশ

রাজা

অবশেষে বুঝিদিতে হ’ল নির্ব্বাসন।

যুবরাজ

না দেখি উপায়।ত্বরা যদি নাহি কর রাজ্য তবে যায়

মহারাজ। সৈন্যগণ নগরপ্রহরীহয়েছে বিদ্রোহী। স্নেহমােহ পরিহরিকর্ত্তব্য সাধন কর—দাও মালিনীরেঅবিলম্বে নির্ব্বাসন!

রাজা

ধীরে, বৎস, ধীরে।দিব তা'রে নির্ব্বাসন,—পূরাব প্রার্থনা-সাধিব কর্ত্তব্য মাের।—মনে করিয়াে নাবৃদ্ধ আমি মােহমুগ্ধ, অন্তর দুর্ব্বল,রাজধর্ম্ম তুচ্ছ করি ফেলি অশ্রুজল।

মহিষীর পুনঃপ্রবেশ

মহিষী

মহারাজ, মহারাজ, বল সত্য করে'কোথা লুকায়েছ তা'রে কাঁদাইতে মােরে?কোথায় সে?

রাজা

কে মহিষী?

মহিষী

মালিনী আমার।

রাজা

কোথায় সে? চলে' গেছে? নাই ঘরে তা'র?

মহিষী

ওগাে নাই। যাও তুমি সৈন্যদল ল’য়েখোঁজ তা'রে পথে পথে আলয়ে আলয়ে,কর ত্বরা। ওগাে তা'রে করিয়াছে চুরিতােমার প্রজারা মিলে। নিষ্ঠুর চাতুরীতাহাদের। দূর করে দাও সর্ব্বজনে।শূন্য করে' দাও এ নগরী, যতক্ষণেফিরে নাহি দেয় মালিনীরে।

রাজা

গেছে চলে’?প্রতিজ্ঞা করিনু আমি ফিরাইব কোলেকোলের কন্যারে মাের। রাজ্যে ধিক্ থাক!ধিক ধর্ম্মহীন রাজনীতি! ডাক, ডাক্সৈন্যদলে।

( যুবরাজের প্রস্থান)

মালিনীকে লইয়া সৈন্যগণ ও প্রজাগণের মশাল ওসমারােহ সহকারে প্রবেশ

ব্রাহ্মণগণ

জয় জয় শুভ্র পুণ্যরাশি,বিগ্রহিণী দয়া।

মহিষী

(ছুটিয়া গিয়া) ওমা, ওমা, সর্ব্বনাশী,ও রাক্ষসী মেয়ে, আমার হৃদয়বাসীনির্দ্দয় পাষাণী, এক পল করি না গােবুকের বাহির—তবু ফাঁকি দিয়ে মা গােকোথা গিয়েছিল?

প্রজাগণ

কোরাে না গাে তিরস্কারমহারাণী। আমাদের ঘরে একবারগিয়েছিল আমাদের মাতা।

চারুদত্ত

কেহ নইআমরা কি, ও গাে রাণী? দেবী দয়াময়ীশুধু তােমাদেরি?

দেবদত্ত

ফিরে ত এনেছি পুনঃপুণ্যবতী প্রাসাদলক্ষীরে।

সােমাচার্য্য

মা গাে শুনআমাদের ভুলিয়াে না আর। মাঝে মাঝেশুনি যেন শ্রীমুখের বাণী, শুভকাজে

পাই আশীর্ব্বাদ; তা হ'লে পরাণ-তরীপথ পাবে পারাবারে ধ্রুবতারা ধরিযাবে মুক্তিপারে।

মালিনী

তােমরা যেয়াে না দূরেএসেছ যাহারা। প্রতিদিন রাজপুরেদেখা দিয়ে যেয়াে। সকলেরে এনাে ডাকি,সবারে দেখিতে চাহি আমি। হেথা থাকির’ব আমি তােমাদেরি ঘরে পুরবাসী।

সকলে

মােরা আজি ধন্য সবে-ধন্য আজি কাশী!

(প্রস্থান)

মালিনী

ওগাে পিতা, আজ আমি হয়েছি সবার।কি আনন্দ উচ্ছ্বসিল, জয়জয়কারউঠিল ধ্বনিয়া যবে, সহস্র হৃদয়মুহূর্ত্তে বিদীর্ণ করি।

রাজা

কি সৌন্দর্য্যময়আজিকার ছবি। সমুদ্রমন্থনে যবেলক্ষ্মী উঠিলেন-তাঁরে ঘেরি কলরবেমাতিল উন্মাদনৃত্যে উর্ম্মিগুলি সবে,

সেই মত উচ্ছ্বসিত জনপারাবার,মাঝে তুমি লােকলক্ষ্মী মাতা।

মালিনী

মা আমারএ প্রাচীরে মােরে আর নারিবে লুকাতে,তব অন্তঃপুরে আমি আনিয়াছি সাথেসর্ব্বলােক,—দেহ নাই মাের, বাধা নাই,আমি যেন এ বিশ্বের প্রাণ।

মহিষা

থাক তাই,বিশ্বপ্রাণ হ'য়ে। আপন করিয়া সবেথাক মা'র কাছে। বাহিরে যেতে না হবে,হেথা নিয়ে আয় তাের বৃহৎ সংসার,মাতা কন্যা দোঁহে মিলি সেবা করি তা'র।অনেক হয়েছে রাত, বােস মা এখানে,শান্ত কর আপনারে—জ্বলিছে নয়ানেউদ্দীপ্ত প্রাণের জ্যোতি নিদ্রার আরামদগ্ধ করি'। একটুকু কর মা বিশ্রাম।

মালিনী

( মাতাকে আলিঙ্গন করিয়া)

মাগাে, শ্রান্ত এবে আমি। কাঁপিতেছে দেহ।কোথা গিয়েছিনু চলে’ ছাড়ি মার’ স্নেহ

প্রকাণ্ড পৃথিবীমাঝে। মাগাে, নিদ্রা আন্চক্ষে মাের। ধীরে ধীরে কর তুই গানশিশুকালে শুনিতাম যাহা; আজি মােরচক্ষে আসিতেছে জল, বিষাদের ঘােরঘনাইছে প্রাণে।

মহিষী

বসুগণ, রুদ্রগণ,বিশ্বদেবগণ, সবে করহ রক্ষণকন্যারে আমার। মর্ত্ত্যলােক, স্বর্গলােকহও অনুকূল—শুভ হােক, শুভ হােককন্যার আমার। হে আদিত্য, হে পবন,করি প্রণিপাত, সর্ব্ব দিকপালগণকর দূর মালিনীর সর্ব্ব অকল্যাণ।—দেখিতে দেখিতে আহা শ্রান্ত দুনয়ানমুদিয়া এসেছে ঘুমে। আহা, মরে' যাই,দূর হাে দূর হােক্ সকল বালাই।—ভয়ে অঙ্গ কাঁপে মাের। কন্যার তােমারএকি খেলা মহারাজ? সমস্ত সংসারখেলার সামগ্রী তা'র,—তা'রে রেখে দিবেআপনার গৃহকোণে, ঘুম পাড়াইবেপদ্মহস্ত পরশিয়া ললাটে তাহার।অবাক হয়েছি দেখে' কাণ্ড বালিকার।

যেমন খেলেনাখানি, তেমনি এ খেলা।মহারাজ, সাবধান হও এই বেলা।নবধর্ম্ম নবধর্ম্ম, কারে বল তুমিকে আনিল নবধর্ম্ম, কোথা তা’র ভূমিআকাশকুসুম? কোন্ মত্ততার স্রোতেভেসে এল-কন্যারে মায়ের কোল হ'তেটানিয়া লইয়া যায়-ধর্ম্ম বলে তায়?তুমিও দিয়াে না যােগ কন্যার খেলায়মহারাজ। বলে' দাও, গ্রহবিপ্রগণকরুক সকলে মিলে শান্তিস্বস্ত্যয়নদেবার্চ্চনা। স্বয়ম্বরসভা আন ডেকে’মালিনীর তরে। মনােমত বর দেখে'খেলা ভেঙে যােগ্যকণ্ঠে দিক বরমালা—দূর হ'বে নবধর্ম্ম, জুড়াইবে জ্বালা।

মালিনী

হায়, কি বলিব! তুমিও কি মাের দ্বারেআসিয়াছ দ্বিজোত্তম? কি দিব তােমারে?কি তর্ক করিব? কি শাস্ত্র দেখাব আনি?তুমি যাহা নাহি জান, আমি কি তা জানি?

সুপ্রিয়

শাস্ত্রসাথে তর্ক করি, নহে তােমাসনে।সভার পণ্ডিত আমি তােমার চরণেবালকের মত। দেবি, লহ মাের ভার।যে পথে লইয়া যাবে, জীবন আমারসাথে যাবে, সর্ব্ব তর্ক করি পরিহার,নীরব ছায়ার মত দীপবর্ত্তিকার।

মালিনী

হে ব্রাহ্মণ, চলে' যায় সকল ক্ষমতাতুমি যবে প্রশ্ন কর, নাহি পাই কথা।

বড়ই বিস্ময় লাগে মনে। হে সুপ্রিয়,মাের কাছে কি জানিতে এসেছ তুমিও?

সুপ্রিয়

জানিবার কিছু নাই, নাহি চাহি জ্ঞান।সব শাস্ত্র পড়িয়াছি, করিয়াছি ধ্যানশত তর্ক শত মত। ভুলাও, ভুলাও,যত জানি সব জানা দূর করে' দাও।পথ আছে শতলক্ষ, শুধু আলাে নাইওগাে দেবী জ্যোতির্ম্ময়ী-তাই আমি চাইএকটি আলাের রেখা উজ্জ্বল সুন্দরতােমার অন্তর হ'তে।

মালিনী

হায় বিপ্রবর,যত তুমি চাহিতেছ আমি যেন ততআপনারে হেরিতেছি দরিদ্রের মত।যে দেবতা মর্ম্মে মাের বজ্রালােক হানিবলেছিল একদিন বিদ্যুন্ময়ী বাণীসে আজি কোথায় গেল। সেদিন, ব্রাহ্মণ,কেন তুমি আসিলে না—কেন এতক্ষণসন্দেহে রহিলে দূরে? বিশ্বে বাহিরিয়াআজি মাের জাগে ভয়—কেঁপে ওঠে হিয়া,

কি করিব কি বলিব বুঝিতে না পারি-মহাধর্ম্ম-তরণীর বালিকা কাণ্ডারীনাহি জানি কোথা যেতে হবে। মনে হয়বড় একাকিনী আমি, সহস্র সংশয়,বৃহৎ সংসার, অসংখ্য জটিল পথ,নানা প্রাণী, দিব্যজ্ঞান ক্ষণপ্রভাবৎক্ষণিকের তরে আসে। তুমি মহাজ্ঞানীহবে কি সহায় মাের?

সুপ্রিয়

বহু ভাগ্য মানিযদি চাহ মােরে।

মালিনী

মাঝে মাঝে নিরুৎসাহরুদ্ধ করে' দেয় যেন সমস্ত প্রবাহঅন্তরের—অকারণ অশ্রুজলে ভাসেদুনয়ন, কি জানি কি বেদনায়। অকস্মাৎআপনার পরে যেন পড়ে দৃষ্টিপাতসহস্র লােকের মাঝে, সেই দুঃসময়েতুমি মাের বন্ধু হবে? মন্ত্রগুরু হ'য়েদিবে নবপ্রাণ?

সুপ্রিয়

প্রস্তুত রাখিব নিত্যএ ক্ষুদ্র জীবন। আমার সকল চিত্তসবল নির্ম্মল করি’, বুদ্ধি করি’ শান্তসমৰ্পণ করি দিব নিয়ত একান্ততব কাজে।

প্রতিহারীর প্রবেশ

প্রতিহারী

প্রজাগণ দরশন যাচে।

মালিনী

আজ নহে, আজ নহে। সকলের কাছেমিনতি আমার; আজি মাের কিছু নাহিরিক্তচিত্ত মাঝে মাঝে ভরিবারে চাহি-বিশ্রাম প্রার্থনা করি ঘুচাতে জড়তা।

(প্রতিহারীর প্রস্থান)যে কথা শুনতেছিলে কহ সেই কথা,আপন কাহিনী। শুনিয়া বিস্ময় লাগে,নূতন বারতা পাই, নবদৃশ্য জাগেচক্ষে মাের। তােমাদের সুখদুঃখ যত,গৃহের বারতা সব আত্মীয়ের মতসকলি প্রত্যক্ষ যেন জানিবারে পাই।ক্ষেমঙ্কর বান্ধব তােমার?

সুপ্রিয়

বন্ধু, ভাই,প্রভু। সূর্য্য সে আমার, আমি রাহু,আমি তা'র মহামােহ; বলিষ্ঠ সে বাহু,আমি তাহে লৌহপাশ। বাল্যকাল হ'তেদৃঢ় সে অটলচিত্ত, সংশয়ের স্রোতেআমি ভাসমান। তবু সে নিয়ত মােরেবন্ধুমােহে বক্ষেমাঝে রাখিয়াছে ধরে'প্রবল অটল প্রেমপাশে, নিঃসন্দেহেবিনা পরিতাপে; চন্দ্রমা যেমন স্নেহেসহাস্যে বহন করে কলঙ্ক অক্ষয়অনন্ত ভ্রমণপথে। ব্যর্থ নাহি হয়বিধির নিয়ম কভু; লৌহময় তরীহােক না যতই দৃঢ়, যদি রাখে ধরি’বক্ষতলে ক্ষুদ্র ছিদ্রটিরে, একদিনসঙ্কটসমুদ্রমাঝে উপায়বিহীনডুবিতে হইবে তা’রে। বন্ধুচিরন্তন,তােমারে ডুবাব আমি, ছিল এ লিখন।

মালিনী

ডুবায়েছ তা'রে?

সুপ্রিয়

দেবি, ডুবায়েছি তা'রে।জীবনের সব কথা বলেছি তােমারে,শুধু সেই কথা আছে বাকি।যেই দিনবিদ্বেষ উঠিল গর্জ্জি দয়াধর্ম্মহীন,তােমারে ঘেরিয়া চারিদিকে,—একাকিনীদাঁড়াইয়া পূর্ণ মহিমায়, কি রাগিণীবাজাইলে বংশীরবে যেন মন্ত্রাহতবিদ্রোহ করিল তা’র ফণা অবনততব পদতলে। শুধু বিপ্র ক্ষেমঙ্কররহিল পাষাণচিত্ত, অটল অন্তর।একদা ধরিয়া কর কহিল সে মােরে“বন্ধু, আমি চলিলাম দূর দেশান্তরে।আনিয়া বিদেশী সৈন্য বরুণার কূলেনবধর্ম্ম উৎপাটন করিব সমূলেপুণ্য কাশী হ’তে।”—চলি গেল রিক্ত হাতেঅজ্ঞাত ভুবনে। শুধু ল’য়ে গেল সাথেআমার হৃদয়, আর, প্রতিজ্ঞা কঠোর।তা’র পরে জান তুমি কি ঘটিল মাের।লভিলাম যেন আমি নবজন্মভূমিযেদিন এ শুষ্কচিত্তে বরষিলে তুমি

সুধাবৃষ্টি। “সর্ব্ব জীবে দয়া”—জানে সবেঅতি পুরাতন কথা— তবু এই ভবেএই কথা বসি’ আছে লক্ষবর্ষ ধরি’সংসারের পরতীরে। তা'রে পার করি'তুমি আজি আনিয়াছ সােনার তরীতেসবার ঘরের দ্বারে। হৃদয়-অমৃতেস্তন্যদান করিয়াছ সে দেবশিশুরে,লয়েছে সে নবজন্ম মানবের পুরেতােমারে মা বলে'।—স্বর্গ আছে কোন্ দূরেকোথায় দেবতা -কেবা সে সংবাদ জানে।শুধু জানি বলি দিয়া আত্ম অভিমানেবাসিতে হইবে ভালো—বিশ্বের বেদনাআপন করিতে হ'বে,—যে কিছু বাসনাশুধু আপনার তরে তাই দুঃখময়।যজ্ঞে যাগে তপস্যায় কভু মুক্তি নয়-মুক্তি শুধু বিশ্বকাজে। ফিরে গিয়ে ঘরেসে নিশীথে কাঁদিয়া কহিনু উচ্চস্বরে—-বন্ধু বন্ধু কোথা গেছ বহু বহু দূরেঅসীম ধরণীতলে মরিতেছ ঘুরে।—ছিনু তা'র পত্রআশেপত্র-নাহি পাইনা জানি সংবাদ। আমি শুধু আসি যাইরাজগৃহমাঝে;—চারিদিকে দৃষ্টি রাখি,

শুধাই বিদেশিজনে, ভয়েভয়ে থাকি-নাবিক যেমন দেখে চকিত নয়নেসমুদ্রের মাঝে—গগনের কোন্ কোণেঘনাইছে ঝড়।—এলাে ঝড় অবশেষেএকখানি ছােট পত্ররূপে। লিখেছে সে-রত্নবতী নগরীর রাজগৃহ হ'তেসৈন্য ল’য়ে আসিছে সে শােণিতের স্রোতেভাসাইতে নবধর্ম্ম—ভিড়াইতে তীরেপিতৃধর্ম্ম মগ্নপ্রায়, রাজকুমারীরেপ্রাণদণ্ড দিতে।—প্রচণ্ড আঘাতে সেইছিঁড়িল প্রাচীন পাশ এক নিমেষেই।রাজারে দেখানু পত্র। মৃগয়ার ছলেগােপনে গেছেন রাজা সৈন্যদলবলেআক্রমিতে তা’রে। আমি হেথা লুটাতেছিপৃথ্বীতলে—আপনার মর্ম্মে ফুটাতেছিদন্ত আপনার।

মালিনী

হায়, কেন তুমি তা'রেআসিতে দিলে না হেথা মাের গৃহদ্বারেসৈন্যসাথে? এ ঘরে সে প্রবেশিত আসি’পূজ্য অতিথির মত—সুচিরপ্রবাসীফিরিত স্বদেশে তা'র।

রাজা

এস আলিঙ্গনেহে সুপ্রিয়! গিয়েছিনু অনুকূলক্ষণেবার্ত্তা পেয়ে। বন্দী করিয়াছি ক্ষেমঙ্করেবিনাক্লেশে। তিলেক বিলম্ব হ'লে পরেসুপ্তরাজগৃহশিরে বজ্র ভয়ঙ্করপড়িত ঝঞ্ঝনি’, জাগিবার অবসরপেতেম না কভু। এস আলিঙ্গনে মমবান্ধব, আত্মীয় তুমি।

সুপ্রিয়

ক্ষম মােরে ক্ষমমহারাজ!

রাজা

শুধু নহে শূন্য আত্মীয়তাপ্রিয়বন্ধু! মনে আনিয়াে না হেন কথাশুধু রাজ-আলিঙ্গনে পুরস্কার তব।কি ঐশ্বর্য্য চাহ? কি সম্মান অভিনবকরিব সৃজন তােমা’তরে? কহ মােরে!

সুপ্রিয়

কিছু নহে, কিছু নহে, খাব ভিক্ষা করে'দ্বারে দ্বারে।

রাজা

সত্য কহ, রাজ্যখণ্ড লবে?

সুপ্রিয়

রাজ্যে ধিক্ থাক!

রাজা

অহো! বুঝিলাম তবেকোন্ পণ চাহ জিনিবারে, কোন্ চাঁদপেতে চাও হাতে? ভালাে, পূরাইব সাধ,দিলাম অভয়। কোন্ অসম্ভব আশাআছে মনে, খুলে বল! কোথা গেল ভাষা।বেশি দিন নহে, বিপ্র, সে কি মনে পড়েএই কন্যা মালিনীর নির্ব্বাসনতরেঅগ্রবর্ত্তী ছিলে তুমি। আজি আরবারকরিবে কি সে প্রার্থনা? রাজদুহিতারনির্ব্বাসন পিতৃগৃহ হ'তে? সাধনারঅসাধ্য কিছুই নাই—বাঞ্ছা সিদ্ধ হবে—ভরসা বাঁধহ বক্ষোমাঝে।—শুন তবে-জীবন-প্রতিমে বৎসে—যে তােমার প্রাণরক্ষা করিয়াছে—সেই বিপ্র গুণবান্সুপ্রিয় সবার প্রিয়, প্রিয়দরশন,তা’রে-

সুপ্রিয়

ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও হে রাজন্!অয়ি দেবি, আজন্মের ভক্তিউপহারেপেয়েছে আপন ঘরে ইষ্টদেবতারেকত অকিঞ্চন-তেমনি পেতেম যদিআমার দেবীরে—রহিতাম নিরবধিধন্য হ'য়ে। রাজহস্ত হ'তে পুরস্কার।কি করেছি? আশৈশববন্ধুত্ব আমারকরেছি বিক্রয়—আজি তারি বিনিময়েল’য়ে যাব শিরে করি’ আপন আলয়েপরিপূর্ণ সার্থকতা? তপস্যা করিয়ামাগিব পরমসিদ্ধি জন্মান্ত ধরিয়া—জন্মান্তরে পাই যদি তবে তাই হােক-বন্ধুর বিশ্বাস ভাঙি সপ্ত স্বর্গলােকচাহি না লভিতে।—পূর্ণকাম তুমি দেবী,আপনার অন্তরের মহত্ত্বেরে সেবি’পেয়েছ অনন্ত শান্তি,—আমি দীনহীনপথে পথে ফিরে মরি অদৃষ্ট অধীনশ্রান্ত নিজভারে। আর কিছু চাহিব না-দিতেছ নিখিলময় যে শুভকামনামনে করে’ অভাগারে তারি এক কণাদিয়ো মনে মনে।

মালিনী

ওরে রমণীর মনকোথা বক্ষোমাঝে বসে’ করিস্ ক্রন্দনমধ্যাহ্নে নির্জ্জননীড়ে প্রিয়বিরহিতাকপােতীর প্রায়?—কি করেছ বল পিতাবন্দীর বিচার?

রাজা

প্রাণদণ্ড হবে তা'র।

মালিনী

ক্ষমা কর। একান্ত এ প্রার্থনা আমারতব পদে।

রাজা

রাজদ্রোহী, ক্ষমিব তাহারেবৎসে?

সুপ্রিয়

কে কার বিচার করে এ সংসারেসে কি চেয়েছিল তব সসাগরা মহীমহারাজ? সে জানিত তুমি ধর্ম্মদ্রোহীতাই সে আসিতেছিল তােমার বিচারকরিতে আপন বলে। বেশি বল যার

সেই বিচারক। সে যদি জিনিত আজিদৈবক্রমে—সে বসিত বিচারক সাজি’তুমি হ’তে অপরাধী।

মালিনী

রাখ প্রাণ তা'রমহারাজ! তা'র পরে স্মরি উপকারহিতৈষী বন্ধুরে তব যাহা ইচ্ছা দিয়ােলবে সে আদর করি।

রাজা

কি বল সুপ্রিয়।বন্ধুরে করিব বন্ধুদান?

সুপ্রিয়

চিরদিনস্মরণে রহিবে তব অনুগ্রহঋণনরপতি।

রাজা

কিন্তু তা'র পূর্ব্বে একবারদেখিব পরীক্ষা করি’ বীরত্ব তাহার।দেখিব মরণভয়ে টলে কি না টলেকর্ত্তব্যের বল। মহত্ত্বের শিখা জ্বলেনক্ষত্রের মত,—দীপ নিবে যায় ঝড়ে,তারা নাহি নিবে।—সে কথা হইবে পরে।

তােমার বন্ধুরে তুমি পাবে, মাঝখানেউপলক্ষ্য আমি। সে দানে তৃপ্তি না মানেমন।—আরাে দিব।—পুরস্কার বলে’ নয়,—রাজার হৃদয় তুমি করিয়াছ জয়-সেথা হ’তে লহ তুলি’ রত্ন সর্ব্বোত্তমহৃদয়ের।–কন্যা, কোথা ছিল এ সরমএতদিন! বালিকার লজ্জাভয়শােকদূর করি দীপ্তি পেত অম্লানআলােকদুঃসহউজ্জ্বল। কোথা হ'তে এল আজঅশ্রুবাপে ছলছল কম্পমান লাজ-যেন দীপ্ত হােমহুতাশনশিখা ছাড়িসদ্য বাহিরিয়া এল স্নিগ্ধ সুকুমারীদ্রুপদদুহিতা।

( সুপ্রিয়ের প্রতি)

উঠ, ছাড়, পদতল।বৎস, বক্ষে, এস। সুখ করিছে বিহ্বলদুর্ভর দুঃখেরি মত। দাও অবসর,হেরি প্রাণপ্রতিমার মুখশশধর,বিরলে আনন্দভরে শুধু ক্ষণকাল।

( সুপ্রিয়ের প্রস্থান)

(স্বগত) বহুদিন পরে মাের মালিনীর ভাল

লজ্জার আভায় রাঙা। কপােল ঊষারযখনি রাঙিয়া উঠে বুঝা যায়, তা'রতপন উদয় হ'তে দেরী নাই আর।এ রাঙা আভাস দেখে আনন্দে আমারহৃদয় উঠিছে ভরি—বুঝিলাম মনেআমাদের কন্যাটুকু বুঝি এতক্ষণেবিকশি উঠিল—দেবী নারে, দয়া নারে,ঘরের সে মেয়ে।

প্রতিহারীর প্রবেশ

প্রতিহারী

জয় মহারাজ, দ্বারেউপনীত বন্দী ক্ষেমঙ্কর।

রাজা

আন তা'রে।

শৃঙ্খলবদ্ধ ক্ষেমঙ্করের প্রবেশ

নেত্র স্থির, ঊর্দ্ধশির, ভ্রূকুটির পরেঘনায়ে রয়েছে ঝড়, হিমাদ্রিশিখরেস্তম্ভিত শ্রাবণ সম।

মালিনী

লােহার শৃঙ্খলধিক্কার মানিছে যেন লজ্জায় বিকল

ওই অঙ্গপরে। মহত্ত্বের অপমানমরে অপমানে। ধন্য মানি এ পরাণইন্দ্রতুল্য হেন মুর্ত্তি হেরি।

রাজা

(বন্দীর প্রতি) কি বিধানহয়েছে শুনেছ?

ক্ষেমঙ্কর

মৃত্যুদণ্ড।

রাজা

যদি প্রাণফিরে দিই, যদি ক্ষমা করি?

ক্ষেমঙ্কর

পুনর্ব্বারতুলিয়া লইতে হ'বে কর্ত্তব্যের ভার,—যে পথে চলিতেছিনু আবার সে পথেযেতে হ'বে।

রাজা

বাঁচিতে চাহ না কোনােমতে!ব্রাহ্মণ, প্রস্তুত হও মমতা তেয়াগি'জীবনের। এই বেলা লহ তবে মাগিপ্রার্থনা যা কিছু থাকে।

ক্ষেমঙ্কর

আর কিছু নাহিবন্ধু সুপ্রিয়েরে শুধু দেখিবারে চাহি।

রাজা

(প্রতিহারীর প্রতি)

ডেকে আন তা'রে।

মালিনী

হৃদয় কাঁপিছে বুকে।কি যেন পরমাশক্তি আছে ওই মুখেবজ্রসম ভয়ঙ্কর। রক্ষা কর পিতঃ,আনিয়াে না সুপ্রিয়েরে।

রাজা

কেন মা শঙ্কিতঅকারণে? কোনাে ভয় নাই।

ক্ষেমঙ্করের নিকট সুপ্রিয়ের আগমন

ক্ষেমঙ্কর

(আলিঙ্গন প্রত্যাখ্যান করিয়া) থাক্ থাক,যাহা বলিবার আছে আগে হ'য়ে যাক-পরে হবে প্রণয়সম্মান।—এস হেথা।জান সখে, বাক্যদীন আমি-বেশি কথাযােগায় না মুখে। সময় অধিক নাই,আমার বিচার হ’ল শেষ—আমি চাই

তােমার বিচার এবে। বল মাের কাছেএ কাজ করেছ কেন?

সুপ্রিয়

বন্ধু এক আছেশ্রেষ্ঠতম, সে আমার আত্মার নিশ্বাস,সব ছেড়ে রাখিয়াছি তাহারি বিশ্বাস,প্রাণসখে, ধর্ম্ম সে আমার।

ক্ষেমঙ্কর

জানি জানিধর্ম্ম কে তােমার। ওই স্তব্ধ মুখখানিঅন্তর্জ্যোতির্ম্ময়, মূর্ত্তিমতী দৈববাণীরাজকন্যারূপে, চতুর্ব্বেদ হ'তে সখেকেড়ে ল’য়ে পিতৃধর্ম্ম ওই নেত্রালোকেদিয়েছ আহুতি তুমি। ধর্ম্ম ওই তব।ওই প্রিয়মুখে তুমি রচিয়াছ নবধর্ম্মশাস্ত্র আজি।—

সুপ্রিয়

সত্য বুঝিয়াছ সখে।মাের ধর্ম্ম অবতীর্ণ দীন মর্ত্ত্যলােকেওই নারীমূর্ত্তি ধরি'। শাস্ত্র এতদিনমাের কাছে ছিল অন্ধ জীবন-বিহীন;

ওই দুটি নেত্রে জ্বলে যে উজ্জ্বল শিখাসে আলােকে পড়িয়াছি বিশ্বশাস্ত্রে লিখাযেথা দয়া সেথা ধর্ম্ম, যেথা প্রেমস্নেহ,যেথায় মানব, যেথা মানবের গেহ।বুঝিলাম, ধর্ম্ম দেয় স্নেহ মাতারূপে,পুত্ররূপে স্নেহ লয় পুনঃ;—দাতারূপেকরে দান, দীনরূপে করে তা' গ্রহণ,—শিষ্যরূপে করে ভক্তি, গুরুরূপে করেআশীর্ব্বাদ; প্রিয় হ'য়ে পাষাণঅন্তরেপ্রেম-উৎস লয় টানি’, অনুরক্ত হ'য়েকরে সর্ব্বসমর্পণ। ধর্ম্ম বিশ্বলােকালয়েফেলিয়াছে চিত্তজাল,—নিখিল ভুবনটানিতেছে প্রেমক্রোড়ে,—সে মহাবন্ধনভরেছে অন্তর মাের আনন্দবেদনেচাহি ওই ঊষারুণ করুণ বদনে।ওই ধর্ম্ম মোর।

ক্ষেমঙ্কর

আমি কি দেখিনি ওরে?আমিও কি ভাবি নাই মুহূর্ত্তের ঘােরেএসেছে অনাদি ধর্ম্ম নারীমূর্ত্তি ধরে’কঠিন পুরুষমন কেড়ে নিয়ে যেতেস্বর্গপানে? ক্ষণতরে মুগ্ধ হৃদয়েতে

জন্মেনি কি স্বপ্নাবেশ? অপূর্ব্ব সঙ্গীতেবক্ষের পঞ্জর মাের লাগিল কাঁদিতেসহস্র বংশীর মত,—সর্ব্ব সফলতা,জীবনের যৌবনের আশাকল্পলতাজড়ায়ে জড়ায়ে মাের অন্তরে অন্তরেমুঞ্জরি উঠিল যেন পত্রপুষ্পভরেএক নিমেষের মাঝে। তবু কি সবলেছিঁড়িনি মায়ার বন্ধ, যাইনি কি চলে’দেশে দেশে দ্বারে দ্বারে, ভিক্ষুকের মতলইনি কি শিরে ধরি অপমান শতহীন হস্ত হ'তে-সহিনি কি অহরহআজন্মের বন্ধু তুমি তােমার বিরহ।—সিদ্ধি যবে লব্ধপ্রায়—তুমি হেথা বসে'কি করেছ—রাজগৃহমাঝে সুখালসেকি ধর্ম্ম মনের মত করেছ সৃজনদীর্ঘ অবসরে?—

সুপ্রিয়

ওগাে বন্ধু, এ ভুবননহে কি বৃহৎ? নাই কি অসংখ্য জন,বিচিত্র স্বভাব? কাহার কি প্রয়ােজন

তুমি কি তা জান? গগনে অগণ্য তারা,নিশিনিশি বিবাদ কি করিছে তাহারাক্ষেমঙ্কর? তেমনি জ্বালায়ে নিজ জ্যোতিকত ধর্ম্ম জাগিতেছে তাহে কোন্ ক্ষতি।

ক্ষেমঙ্কর

মিছে আর কেন বন্ধু। ফুরাল সময়,বাক্য ল’য়ে মিথ্যা খেলা, তর্ক আর নয়।সত্যমিথ্যা পাশাপাশি নির্ব্বিরােধে র’বেএত স্থান নাহি নাহি অনন্ত এ ভবে।অন্নরূপে ধান্য যেথা উঠে চিরদিনরােপিবে তাহারি মাঝে কণ্টক নবীনহে সুপ্রিয়, প্রেম এত সর্ব্বপ্রেমী নয়।ছিল চিরদিবসের বিশ্রব্ধ প্রণয়আনিবে বিশ্বাসঘাত বক্ষোমাঝে তা'রবন্ধু মাের, উদারতা এত কি উদার।কেহ বা ধর্ম্মের লাগি সহি নির্য্যাতনঅকালে অস্থানে মরে চোরের মতন,কেহ বা ধর্ম্মের ব্রত করিয়া নিস্ফলবাঁচিবে সম্মানে সুখে, এ ধরণীতলহেন বিপরীত ধর্ম্ম এক বক্ষে বহে—এত বড় এত দৃঢ় কভু নহে নহে।

সুপ্রিয়

(মালিনীর প্রতি ফিরিয়া)

হে দেবি, তােমারি জয়! নিজ পদ্মকরেযে পবিত্র শিখা তুমি আমার অন্তরেজ্বালায়েছ-আজি হ’ল পরীক্ষা তাহার-তুমি হ'লে জয়ী। সর্ব্ব অপমানভারসকল নিষ্ঠুরঘাত করিনু গ্রহণ।রক্ত উচ্ছ্বসিয়া উঠে উৎসের মতনবিদীর্ণ হৃদয় হতে,—তবু সমুজ্জ্বলতব শান্তি, তব প্রীতি, তব সুমঙ্গলঅম্লান অচল দীপ্তি করিছে বিরাজসর্ব্বোপরি। ভক্তের পরীক্ষা হ’ল আজ,জয় দেবি।—ক্ষেমঙ্কর, তুমি দিবে প্রাণ,—আমার ধর্ম্মের লাগি করিয়াছি দানপ্রাণের অধিক প্রিয় তােমার প্রণয়,তােমার বিশ্বাস। তা'র কাছে প্রাণভয়তুচ্ছ শতবার।

ক্ষেমঙ্কর

ছাড় এ প্রলাপ বাণী।মৃত্যু যিনি তাঁহারেই ধর্ম্মরাজ জানি,—ধর্ম্মের পরীক্ষা তাঁরি কাছে। বন্ধুবর,এস তবে কাছে, এস ধর মাের কর,

চল মােরা যাই সেথা দোঁহে এক সনে,—যেমন সে বাল্যকালে—সে কি পড়ে মনে-কত দিন সারারাত্রি তর্ক করি', শেষেপ্রভাতে যেতেম দোঁহে গুরুর উদ্দেশেকে সত্য কে মিথ্যা তাহা করিতে নির্ণয়।তেমনি প্রভাত হােক! সকল সংশয়আজিকে লইয়া চলি অসংশয় ধামে,দাঁড়াই মৃত্যুর পাশে দক্ষিণে ও বামেদুই সখা, ল’য়ে দুজনের প্রশ্ন যত।সেথায় প্রত্যক্ষ সত্য উজ্জ্বল উন্নত;—মূহূর্ত্তে পর্ব্বতপ্রায় বিচার বিরােধবাষ্পসম কোথা যা'বে! দুইটি অবােধআনন্দে হাসিব চাহি দোঁহে দোঁহাকারে।সব চেয়ে বড় আজি মনে কর যারেতাহারে রাখিয়া দেখ মৃত্যুর সম্মুখে।

সুপ্রিয়

বন্ধু, তাই হােক।

ক্ষেমঙ্কর

এস তবে, এস বুকে।বহুদূরে গিয়েছিলে এস কাছে তবেযেথায় অনন্তকাল বিচ্ছেদ না হ'বে।

লই তবে বন্ধুহস্তে করুণ বিচার-এই লহ।

(শৃঙ্খল দ্বারা সুপ্রিয়ের মস্তকে আঘাত ও তাহার পতন )

সুপ্রিয়

দেবী, তব জয়। (মৃত্যু)

ক্ষেমাঙ্কর

(মৃতদেহের উপর পড়িয়া) এইবারডাক, ডাক ঘাতকেরে।

রাজা

(সিংহাসন ছাড়িয়া) কে আছিস্ ওরে!আন্ খড়গ।

মালিনী

মহারাজ ক্ষম ক্ষেমঙ্করে।

( মূর্চ্ছিতা )