আবেদন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

চিত্রা

ভৃত্য। জয় হোক্‌ মহারাণী! রাজরাজেশ্বরী,দীন ভূত্যে কর দয়া!

রাণী। সভা ভঙ্গ করি’সকলেই গেল চলি’ যথাযোগ্য কাজেআমার সেবকবৃন্দ বিশ্বরাজ্য মাঝে,মোর আজ্ঞা মোর মান লয়ে শীর্ষদেশেজয়শঙ্খ সগর্ব্বে বাজায়ে। সভাশেষেতুমি এলে নিশান্তের শশাঙ্ক সমানভক্ত ভৃত্য মোর? কি প্রার্থনা?ভৃত্য। মোর স্থানসর্ব্বশেষে, আমি তব সর্ব্বাধম দাসমহোত্তমে! একে একে পরিতৃপ্ত আশসবাই আনন্দে যবে ঘরে ফিরে যায়সেইক্ষণে আমি আসি নির্জ্জন সভায়;একাকী আসীনা তব চরণতলেরপ্রান্তে বসে’ ভিক্ষা মাগি শুধু সকলেরসর্ব্ব অবশেষটুকু!রাণী। অবোধ ভিক্ষুক,অসময়ে কি তোরে মিলিবে?ভৃত্য। হাসি মুখদেখে চলে’ যাব। আছে দেবী, আরো আছে;—নানা কর্ম নানা পদ নিল তোর কাছে

নানা জনে,—এক কর্ম্ম কেহ চাহে নাই-ভৃত্য পরে দয়া করে’ দেহ মোরে তাই,—আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!রাণী। মালাকর?ভৃত্য। ক্ষুদ্র মালাকর। অবসরলব সব কাজে। যুদ্ধ-অস্ত্র ধনুঃশরফেলিনু ভূতলে; এ উষ্ণীষ রাজসাজরাখিনু চরণে তব,—যত উচ্চ কাজসব ফিরে লও দেবী! তব দূত করিমোরে আর পাঠায়োনা, তব স্বর্ণতরীদেশে দেশান্তরে লয়ে; জয়ধ্বজা তবদিদিগন্তে করিয়া প্রচার, নব নবদিগ্বিজয়ে পাঠায়োনা মোরে! পর পারেতব রাজ্য কর্ম যশ ধন জন ভারেঅসীমবিস্তৃত,—কত নগর নগরী,কত লোকালয়, বন্দরেতে কত তরী,বিপণীতে কত পণ্য;—ওই দেখ দূরেমন্দির শিখরে আর কত হর্ম্ম্যচূড়েদিগন্তেরে করিছে দংশন; কলোচ্ছ্বাসশ্বসিয়া উঠিছে শূন্যে করিবারে গ্রাস

নক্ষত্রের নিত্য নীরবতা। বহু ভৃত্যআছে হোথা, বহু সৈন্য তব, জাগে নিত্যকতই প্রহরী! এ পারে নির্জ্জন তীরেএকাকী উঠেছে ঊর্দ্ধে উচ্চ গিরিশিরেরঞ্জিত মেঘের মাঝে তুষারধবলতোমার প্রাসাদ-সৌধ,—অনিন্দ্য নির্ম্মলচন্দ্রকান্ত মণিময়। বিজনে বিরলেহেথা তব দক্ষিণের বাতায়ন তলেমঞ্জরিত ইন্দুমল্লী বল্লরী বিতানে,ঘনচ্ছায়ে, নিভৃত কপোত-কলগানেএকান্তে কাটিবে বেলা; স্ফটিক প্রাঙ্গণেজলযন্ত্রে উৎসধারা কল্লোল-ক্রন্দনেউচ্ছসিবে দীর্ঘ দিন ছল ছল ছল-মধ্যাহূেরে করি দিবে বেদনা-বিহ্বলকরুণা-কাতর; অদূরে অলিন্দপরেপুঞ্জ পুচ্ছ বিস্ফারিয়া স্ফীত গর্ব্বভরেনাচিবে ভবন শিখী-রাজহংসদলচরিবে শৈবাল বনে করি কোলাহলবাঁকায়ে ধবলগ্রীবা; পাটলা হরিণীফিরিবে শ্যামল ছায়ে; অয়ি একাকিনী,

আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!রাণী। ওরে তুই কর্ম্মভীরু অলস কিঙ্কর,কি কাজে লাগিবি?ভৃত্য। অকাজের কাজ যত,আলস্যের সহস্র সঞ্চয়। শত শতআনন্দের আয়োজন। যে অরণ্যপথেকর তুমি সঞ্চরণ বসন্তে শরতেপ্রত্যুষে অরুণোদয়ে- শ্লথ অঙ্গ হতেতপ্ত নিদ্রালসখানি সিগ্ধ বায়ুস্রোতেকরি দিয়া বিসর্জ্জন—সে বন-বীথিকারাখিব নবীন করি; পুষ্পাক্ষরে লিখাতব চরণের স্তুতি প্রত্যহ উষায়বিকশি উঠিবে তব পরশ তৃষায়পুলকিত তৃণপুঞ্জতলে। সন্ধ্যাকালেযে মঞ্জু মালিকাখানি জড়াইবে ভালেকবরী বেষ্টন করি,আমি নিজ করেরচি’ সে বিচিত্র মালা সান্ধ্য যূথীস্তরে,সাজায়ে সুবর্ণ পাত্রে তোমার সম্মুখেনিঃশব্দে ধরিব আসি অবনত মুখে,—

যেথায় নিভৃত কক্ষে, ঘন কেশ পাশ,তিমির নির্ঝরসম উন্মুক্ত-উচ্ছ্বাসতরঙ্গ-কুটিল, এলাইয়া পৃষ্ঠ পরে,কনক মুকুর অঙ্কে, শুভ্র পদ্ম করেবিনাইবে বেণী। কুমুদ সরসী কূলেবসিবে যখন, সপ্তপর্ণ তরুমূলেমালতী দোলায়-পত্রচ্ছেদ-অবকাশেপড়িবে ললাটে চক্ষে বক্ষে বেশবাসেকৌতূহলী চন্দ্রমার সহস্র চুম্বন;—আনন্দিত তনুখানি করিয়া বেষ্টনউঠিবে বনের গন্ধ বাসনা-বিভোলমৃদু মন্দ সমীরের মত। অনিমেষেযে প্রদীপ জ্বলে তব শয্যা শিরোদেশেসারা সুপ্তনিশি, সুরনরস্বপ্নাতীতনিদ্রিত অঙ্গপানে স্থির অকম্পিতনিদ্রাহীন আঁখি মেলি -সে প্রদীপখানিআমি জালাইয়া দিব গন্ধতৈল আনি।শেফালির বৃন্ত দিয়া রাঙাইব, রাণী,বসন বাসন্তী রঙে; পাদপীঠখানি

নব ভাবে নব রূপে শুভ আলিম্পনেপ্রত্যহ রাখিব অঙ্কি কুঙ্কুমে চন্দনেকল্পনার লেখা! নিকুঞ্জের অনুচর,আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!রাণী। কি লইবে পুরস্কার?ভৃত্য। প্রত্যহ প্রভাতেফুলের কঙ্কণ গড়ি, কমলের পাতেআনিব যখন,—পদ্মের কলিকাসমক্ষুদ্র তব মুষ্টিখানি করে ধরি মমআপনি পরায়ে দিব, এই পুরস্কার।প্রতি সন্ধ্যাবেলা, অশোকের রক্তকান্তেচিত্রি’ পদতল, চরণ-অঙ্গুলি-প্রান্তেলেশমাত্র রেণু-চুম্বিয়া মুছিয়া লবএই পুরস্কার!রাণী। ভৃত্য, আবেদন তবকরিনু গ্রহণ। আছে মোর বহু মন্ত্রীবহু সৈন্য বহু সেনাপতি,বহু যন্ত্রীকর্ম্মযন্ত্রে রত,—তুই থাক্ চিরদিনস্বেচ্ছাবন্দী দাস, খ্যাতিহীন কর্ম্মহীন!

রাজসভা বহিঃপ্রান্তে রবে তোর ঘর-তুই মোর মালঞ্চের হবি মালাকর!