মৃত্যুর পরে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

চিত্রা

আজিকে হয়েছে শান্তিজীবনের ভুলভ্রান্তিসব গেছে চুকে!রাত্রিদিন ধুক্‌ধুক্‌তরঙ্গিত দুঃখ সুখথামিয়াছে বুকে!

যত কিছু ভালমন্দ,যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বকিছু আর নাই!বল শান্তি, বল শান্তি,দেহসাথে সব ক্লান্তিহয়ে যাক্ ছাই!

গুঞ্জরি’ করুণ তানধীরে ধীরে কর গানবসিয়া শিয়রে!যদি কোথা থাকে লেশজীবন-স্বপ্নের শেষতাও যাক্‌ মরে!তুলিয়া অঞ্চলখানিমুখ পরে দাও টানি,ঢেকে দাও দেহ!করুণ মরণ যথাঢাকিয়াছে সব ব্যথা,সকল সন্দেহ!

বিশ্বের আলোেক যতদিগ্বিদিকে অবিরতযাইতেছে বয়ে’,শুধু ওই আঁখি পরেনামে তাহা স্নেহভরেঅন্ধকার হয়ে।জগতের তন্ত্রীরাজিদিনে উচ্চে উঠে বাজিরাত্রে চুপে চুপে,সে শব্দ তাহার পরেচুম্বনের মত পড়েনীরবতা রূপে!

মিছে আনিয়াছ আজিবসন্ত কুসুমরাজিদিতে উপহার!নীরবে আকুল চেখেফেলিতেছ বৃথা শোকেনয়নাশ্রুধার!

ছিলে যারা রোষভরেবৃথা এত দিন পরেকরিছ মার্জ্জনা!অসীম নিস্তব্ধ দেশেচিররাত্রি পেয়েছে সেঅনন্ত সান্ত্বনা!

গিয়েছে কি আছে বসে,জাগিল কি ঘুমাল সেকে দিবে উত্তর?পৃথিবীর শ্রান্তি তারেত্যজিল কি একেবারে,জীবনের জ্বর?এখনি কি দুঃখ সুখেকর্ম্মপথ অভিমুখেচলেছে আবার?অস্তিত্বের চক্রতলেএকবার বাঁধা পলেপায় কি নিস্তার?

বসিয়া আপন দ্বারেভালমন্দ বল তারেযাহা ইচ্ছা তাই!অনন্ত জনম মাঝেগেছে সে অনন্ত কাজে,সে আর সে নাই।আর পরিচিত মুখেতোমাদের দুখে সুখেআসিবে না ফিরে,তবে তার কথা থাক্‌,যে গেছে সে চলে যাক্‌বিস্মৃতির তীরে!

জানিনা কিসের তরেযে যাহার কাজ করেসংসারে আসিয়া,ভাল মন্দ শেষ করিযায় জীর্ণ জন্মতরীকোথায় ভাসিয়া!

দিয়ে যায় যত যাহারাখ তাহা ফেল তাহাযা ইচ্ছা তোমার!সে ত নহে বেচা-কেনা,ফিরিবে না ফেরাবে নাজন্ম-উপহার!

কেন এই আনা গোনা,কেন মিছে দেখাশোনাদুদিনের তরে;কেন বুকভরা আশা,কেন এত ভালবাসাঅন্তরে অন্তরে;আয়ু যার এতটুক্‌,এত দুঃখ এত সুখকেন তার মাঝে;অকস্মাৎ এ সংসারেকে বাঁধিয়া দিল তারেশত লক্ষ কাজে;

হেথায় যে অসম্পূর্ণ,সহস্র আঘাতে চূর্ণবিদীর্ণ বিকৃতকোথাও কি একবারসম্পূর্ণতা আছে তারজীবিত কি মৃত;জীবনে যা প্রতিদিনছিল মিথ্যা অর্থহীনছিন্ন ছড়াছড়িমৃত্যু কি ভরিয়া সাজিতারে গাঁথিয়াছে আজিঅর্থ পূর্ণ করি;

হেথা যারে মনে হয়শুধু বিফলতাময়অনিত্য চঞ্চলসেথায় কি চুপে চুপেঅপূর্ব্ব নুতনরূপেহয় সে সফল;

চিরকাল এই সবরহস্য আছে নীরবরুদ্ধ ওষ্ঠাধর,জন্মান্তের নব প্রাতেসে হয় ত আপনাতেপেয়েছে উত্তর!

সে হয় ত দেখিয়াছেপড়ে যাহা ছিল পাছেআজি তাহা আগে;ছোট যাহা চিরদিনছিল অন্ধকারে লীন,বড় হয়ে জাগে;যেথায় ঘৃণার সাথেমানুষ আপন হাতেলেপিয়াছে কালীনূতন নিয়মে সেথাজ্যোতির্ময় উজ্জ্বলতাকে দিয়াছে জ্বালি!

কত শিক্ষা পৃথিবীরখসে’ পড়ে জীর্ণচীর,জীবনের সনে,সংসারের লজ্জাভয়নিমেষেতে দগ্ধ হয়চিতা-হুতাশনে;সকল অভ্যাস-ছাড়াসর্ব্ব আবরণ হারাসদ্য শিশুসমনগ্নমূর্তি মরণেরনিষ্কলঙ্ক চরণেরসম্মুখে প্রণম’!

আপন মনের মতসঙ্কীর্ণ বিচার যতরেখে দাও আজ!ভুলে যাও কিছুক্ষণপ্রত্যহের আয়োজন,সংসারের কাজ!

আজি ক্ষণেকের তরেবসি বাতায়ন পরেবাহিরেতে চাহ!অসীম আকাশ হতেবহিয়া আসুক্‌ স্রোতেবৃহৎ প্রবাহ!

উঠিছে ঝিল্লির গান,তরুর মর্ম্মর তান,নদী কলস্বর,প্রহরের আনাগোনাযেন রাত্রে যায় শোনাআকাশের পর!উঠিতেছে চরাচরেঅনাদি অনন্তস্বরেসঙ্গীত উদারসে নিত্য-গানের সনেমিশাইয়া লহ মনেজীবন তাহার!

ব্যাপিয়া সমস্ত বিশ্বেদেখ তারে সর্ব্বদৃশ্যেবৃহৎ করিয়া;জীবনের খুলি ধুয়েদেখ তারে দুরে থুয়েসম্মুখে ধরিয়া!পলে পলে দণ্ডে দণ্ডেভাগ করি খণ্ডে খণ্ডেমাপিয়ো না তারে!থাক্‌ তব ক্ষুদ্র মাপক্ষুদ্র পুণ্য, ক্ষুদ্র পাপসংসারের পারে!

আজ বাদে কাল যারেভুলে যাবে একেবারেপরের মতনতারে লয়ে আজি কেনবিচার বিরোধ হেন,এত আলাপন!

যে বিশ্ব কোলের পরেচির দিবসের তরেতুলে নিল তারেতার মুখে শব্দ নাহি,প্রশান্ত সে আছে চাহিঢাকি আপনারে!

বৃথা তারে প্রশ্ন করি,বৃথা তার পায়ে ধরি,বৃথা মরি কেঁদে;—খুঁজে ফিরি অশ্রুজলে-কোন্ অঞ্চলের তলেনিয়েছে সে বেঁধে;ছুটিয়া মৃত্যুর পিছেফিরে নিতে চাহি মিছে;—সে কি আমাদের?পলেক বিচ্ছেদে হায়তখনি ত বুঝা যায়সে যে অনন্তের!

চক্ষের আড়ালে তাইকত ভয় সংখ্যা নাই;সহস্র ভাবনা!মুহূর্ত্ত মিলন হলেটেনে নিই বুকে কোলে,অতৃপ্ত কামনা!পার্শ্বে বসে ধরি মুঠি,শব্দমাত্রে কেঁপে উঠি,চাহি চারিভিতে,অনন্তের ধনটিরেআপনার বুক চিরেচাহি লুকাইতে!

হায়রে নির্ব্বোধ নর,কোথা তোর আছে ঘর,কোথা তোর স্থান!শুধু তোর ওইটুকঅতিশয় ক্ষুদ্র বুকভয়ে কম্পমান!

ঊর্দ্ধে ওই দেখ চেয়েসমস্ত আকাশ ছেয়েঅনন্তের দেশ,সে যখন একধারেলুকায়ে রাখিবে তারেপাবি কি উদ্দেশ?

ওই হের সীমাহারাগগনেতে গ্রহতারাঅসংখ্য জগৎ,ওরি মাঝে পরিভ্রান্তহয় ত সে একা পান্থখুঁজিতেছে,পথ!ওই দূর দূরান্তরেঅজ্ঞাত ভুবন পরেকভু কোন খানেআর কি গো দেখা হবে,আর কি সে কথা কবে,কেহ নাহি জানে!

যা হবার তাই হোক্‌,ঘুচে যাক্‌ সর্ব্বশোক,সর্ব্ব মরীচিকা!নিবে যাক্ চিরদিনপরিশ্রান্ত পরিক্ষীণমর্ত্ত্য জন্ম-শিখা!সব তর্ক হোক্ শেষ,সব রাগ সব দ্বেষ,সকল বালাই!বল শান্তি বল শান্তিদেহ সাথে সব ক্লান্তিপুড়ে হোক্‌ ছাই!