পদ্মা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

চৈতালি

হে পদ্মা আমার,তোমায় আমায় দেখা শত শত বার।একদিন জনহীন তোমার পুলিনে,গোধূলির শুভলগ্নে হেমন্তের দিনে,সাক্ষী করি পশ্চিমের সূর্য অস্তমানতোমারে সঁপিয়াছিনু আমার পরান।অবসানসন্ধ্যালোকে আছিলে সেদিননতমুখী বধূসম শান্ত বাক্যহীন;সন্ধ্যাতারা একাকিনী সস্নেহ কৌতুকেচেয়ে ছিল তোমা-পানে হাসিভরা মুখে।সেদিনের পর হতে হে পদ্মা আমার,তোমায় আমায় দেখা শত শত বার।

নানা কর্মে মোর কাছে আসে নানা জন,নাহি জানে আমাদের পরানবন্ধন;নাহি জানে, কেন আসি সন্ধ্যা-অভিসারেবালুকা-শয়ন-পাতা নির্জন এ পারে।যখন মুখর তব চক্রবাকদলসুপ্ত থাকে জলাশয়ে ছাড়ি কোলাহল,

যখন নিস্তব্ধ গ্রামে তব পূর্বতীরেরুদ্ধ হয়ে যায় দ্বার কুটিরে কুটিরে,তুমি কোন্‌ গান কর আমি কোন্‌ গানদুই তীরে কেহ তার পায় নি সন্ধান।নিভৃতে শরতে গ্রীষ্মে শীতে বরষায়শত বার দেখাশুনা তোমায় আমায়।

কতদিন ভাবিয়াছি বসি তব তীরেপরজন্মে এ ধরায় যদি আসি ফিরে,যদি কোনো দূরতর জন্মভূমি হতেতরী বেয়ে ভেসে আসি তব খরস্রোতে—কত গ্রাম, কত মাঠ, কত ঝাউঝাড়,কত বালুচর, কত ভেঙে-পড়া পাড়পার হয়ে এই ঠাঁই আসিব যখনজেগে উঠিবে না কোনো গভীর চেতন?জন্মান্তরে শতবার যে নির্জন তীরেগোপন হৃদয় মোর আসিত বাহিরে,আর বার সেই তীরে সে সন্ধ্যাবেলায়হবে না কি দেখাশুনা তোমায় আমায়?