নৈবেদ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

আষাঢ় ১৩০৮

পরিচ্ছেদসমূহ (মূল গ্রন্থে নেই)

পরিচ্ছেদ

প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী

আমার এ ঘরে আপনার করে

নিশীথশয়নে ভেবে রাখি মনে

তোমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে

যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার

সংসার যবে মন কেড়ে লয়

জীবনে আমার যত আনন্দ

কাব্যের কথা বাঁধা পড়ে যথা

না বুঝেও আমি বুঝেছি তোমারে

যার কাছে আছে তারা কাছে থাক্

আঁধারে আবৃত ঘন সংশয়

অমল কমল সহজে জলের কোলে

সকল গর্ব দূর করি দিব

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে

আঁধার আসিতে রজনীর দীপ

ভক্ত করিছে প্রভুর চরণে

অল্প লইয়া থাকি তাই মোর

পাঠাইলে আজি মৃত্যুর দূত

প্রতিদিন তব গাথা

তোমার পতাকা যারে দাও তারে

ঘাটে বসে আছি আনমনা

মধ্যাহ্নে নগর-মাঝে পথ হতে পথে

আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে

মাঝে মাঝে কত বার ভাবি, কর্মহীন

আবার আমার হাতে বীণা দাও তুলি

এ আমার শরীরের শিরায় শিরায়

দেহে আর মনে প্রাণে হয়ে একাকার

তুমি তবে এসো নাথ, বসো শুভক্ষণে

ক্রমে ম্লান হয়ে আসে নয়নের জ্যোতি

বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয়

তোমার ভুবন-মাঝে ফিরি মুগ্ধসম

নির্জন শয়ন-মাঝে কালি রাত্রিবেলা

তখন করি নি নাথ, কোনো আয়োজন

কারে দূর নাহি কর। যত করি দান

কালি হাস্যে পরিহাসে গানে আলোচনে

কোথা হতে আসিয়াছি, নাহি পড়ে মনে

মহারাজ ক্ষণেক দর্শন দিতে হবে

প্রভাতে যখন শঙ্খ উঠেছিল বাজি

হে রাজেন্দ্র, তব হাতে কাল অন্তহীন

তোমার ইঙ্গিতখানি দেখি নি যখন

তব পূজা না আনিলে দণ্ড দিবে তারে

সেই তো প্রেমের গর্ব, ভক্তির গৌরব

কত-না তুষারপুঞ্জ আছে সুপ্ত হয়ে

মর্তবাসীদের তুমি যা দিয়েছ প্রভু

যে ভক্তি তোমারে লয়ে ধৈর্য নাহি মানে

মাতৃস্নেহবিগলিত স্তন্যক্ষীররস

আঘাতসংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি

এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়

অন্ধকার গর্তে থাকে অন্ধ সরীসৃপ

তোমারে শতধা করি ক্ষুদ্র করি দিয়া

হে রাজেন্দ্র, তোমা-কাছে নত হতে গেলে

দুর্গম পথের প্রান্তে পান্থশালা-’পরে

তুমি সর্বাশ্রয়, এ কি শুধু শূন্যকথা?

আমারে সৃজন করি যে মহাসম্মান

তুমি মোরে অর্পিয়াছ যত অধিকার

ত্রাসে লাজে নতশিরে নিত্য নিরবধি

হে সকল ঈশ্বরের পরম ঈশ্বর

তাঁহারা দেখিয়াছেন— বিশ্বচরাচর

আমরা কোথায় আছি, কোথায় সুদূরে

একদা এ ভারতের কোন্‌ বনতলে

এ মৃত্যু ছেদিতে হবে, এই ভয়জাল

তব চরণের আশা, ওগো মহারাজ

পতিত ভারতে তুমি কোন্‌ জাগরণে

শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে

স্বার্থের সমাপ্তি অপঘাতে অকস্মাৎ

এই পশ্চিমের কোণে রক্তরাগরেখা

সে পরম পরিপূর্ণ প্রভাতের লাগি

সে উদার প্রত্যুষের প্রথম অরুণ

তাঁরি হস্ত হতে নিয়ো তব দুঃখভার

তোমার ন্যায়ের দন্ড প্রত্যেকের করে

ওরে মৌনমূক, কেন আছিস নীরবে

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির

আমি ভালোবাসি, দেব, এই বাঙ্গালার

এ নদীর কলধ্বনি যেথায় বাজে না

আমার সকল অঙ্গে তোমার পরশ

অচিন্ত্য এ ব্রহ্মান্ডের লোক-লোকান্তরে

না গণি মনের ক্ষতি ধনের ক্ষতিতে

এ কথা স্মরণে রাখা কেন গো কঠিন

তোমারে বলেছে যারা পুত্র হতে প্রিয়

হে অনন্ত, যেথা তুমি ধারণা-অতীত

একাধারে তুমিই আকাশ, তুমি নীড়

তব প্রেমে ধন্য তুমি করেছ আমারে

হে দূর হইতে দূর, হে নিকটতম

মুক্ত করো, মুক্ত করো নিন্দাপ্রশংসার

দুর্দিন ঘনায়ে এল ঘন অন্ধকারে

দীর্ঘকাল অনাবৃষ্টি, অতি দীর্ঘকাল

আমার এ মানসের কানন কাঙাল

এ কথা মানিব আমি, এক হতে দুই

জীবনের সিংহদ্বারে পশিনু যে ক্ষণে

মৃত্যুও অজ্ঞাত মোর। আজি তার তরে

বাসনারে খর্ব করি দাও হে প্রাণেশ

শক্তিদম্ভ স্বার্থলোভ মারীর মতন

কোরো না কোরো না লজ্জা হে ভারতবাসী

হে ভারত, নৃপতিরে শিখায়েছ তুমি

হে ভারত, তব শিক্ষা দিয়েছে যে ধন

অন্তরের সে সম্পদ ফেলেছি হারায়ে

শক্তি মোর অতি অল্প, হে দীনবৎসল

মাঝে মাঝে কভু যবে অবসাদ আসি

তব কাছে এই মোর শেষ নিবেদন

সংসারে মোরে রাখিয়াছ যেই ঘরে