আধুনিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

প্রহাসিনী

চিঠি তব পড়িলাম, বলিবার নাই মোর,তাপ কিছু আছে তাহে, সন্তাপ তাই মোর।কবিগিরি ফলাবার উৎসাহ-বন্যায়আধুনিকাদের 'পরে করিয়াছি অন্যায়যদি সন্দেহ কর এত বড়ো অবিনয়,চুপ ক’রে যে সহিবে সে কখনো কবি নয়।বলিব দু-চার কথা, ভালো মনে শুনো তা;পূরণ করিয়া নিয়ো প্রকাশের ন্যূনতা॥

পাঁজিতে যে আঁক টানে গ্রহ-নক্ষত্তরআমি তো তদনুসারে পেরিয়েছি সত্তর।আয়ুর তবিল মোর কুষ্ঠির হিসাবেঅতি অল্প দিনেই শূন্যেতে মিশাবে।চলিতে চলিতে পথে আজকাল হরদমবুকে লাগে যমরথচক্রের কর্দম।তবু মোর নাম আজো পারিবে না ওঠাতেপ্রাত্নিক তত্ত্বের গবেষণা-কোঠাতে।জীর্ণ জীবনে আজ রঙ নাই, মধু নাই—মনে রেখো, তবু আমি জন্মেছি অধুনাই।সাড়ে আঠারো শতক এ. ডি., সে যে বি. সি. নয়;মোর যারা মেয়ে-বোন নারদের পিসি নয়।আধুনিকা যারে বল তারে আমি চিনি যে,কবিযশে তারি কাছে বারো আনা ঋণী যে।তারি হাতে চিরদিন যৎপরোনাস্তিপেয়েছি পুরস্কার, পেয়েছিও শাস্তি।প্রমাণ গিয়েছি রেখে, এ-কালিনী রমণীররমণীয় তালে বাঁধা ছন্দ এ ধমনীর।কাছে পাই হারাই-বা তবু তারি স্মৃতিতেসুরসৌরভ জাগে আজো মোর গীতিতে।মনোলোকে দূতী যারা মাধুরীনিকুঞ্জেগুঞ্জন করিয়াছি তাহাদেরি গুণ-যে।

সেকালেও কালিদাস-বররুচি-আদিরাপুরসুন্দরীদের প্রশস্তিবাদীরযাদের মহিমাগানে জাগালেন বীণারেতারাও সবাই ছিল অধুনার কিনারে।আধুনিকা ছিল নাকো হেন কাল ছিল না,তাহাদেরি কল্যাণে কাব্যানুশীলনা।পুরুষ কবির ভালে আছে কোনো সুগ্রহ,চিরকাল তাই তারে এত মহানুগ্রহ।জুতা-পায়ে খালি-পায়ে স্লিপারে বা নূপুরেনবীনারা যুগে যুগে এল দিনে দুপুরে,যেথা স্বপনের পাড়া সেথা যায় আগিয়ে,প্রাণটাকে নাড়া দিয়ে গান যায় জাগিয়ে।তবু কবি-রচনায় যদি কোনো ললনাদেখো অকৃতজ্ঞতা, জেনো সেটা ছলনা।মিঠে আর কটু মিলে, মিছে আর সত্যি,ঠোকাঠুকি ক’রে হয় রস-উৎপত্তি।মিষ্ট-কটুর মাঝে কোন্‌টা যে মিথ্যেসে কথাটা চাপা থাক্ কবির সাহিত্যে।ওই দেখো, ওট। বুঝি হল শ্লেষবাক্য।এরকম বাঁকা কথা ঢাকা দিয়ে রাখ্য।প্রলোভনরূপে আসে পরিহাসপটুতা,সামলানো নাহি যায় অকারণ কটুতা।

বারে বারে এইমতো করি অত্যুক্তি,ক্ষমা করে কোরো সেই অপরাধমুক্তি

আর যা-ই বলি নাকে। এ কথাটা বলিবই,তোমাদের দ্বারে মোরা ভিক্ষার থলি বই।অন্ন ভরিয়া দাও সুধা তাহে লুকিয়ে,মূল্য তাহারি আমি কিছু যাই চুকিয়ে ৷অনেক গেয়েছি গান মুগ্ধ এ প্রাণ দিয়ে—তোমরা তো শুনেছ তা, অন্তত কান দিয়ে।পুরুষ পরুষ ভাষে করে সমালোচনা,সে অকালে তোমাদেরি বাণী হয় রোচনা।করুণায় ব’লে থাকো, “আহা, মন্দ বা কী।”খুটে বের কর না তো কোনো ছন্দ-ফাঁকি ৷এইটুকু যা মিলেছে তাই পায় কজনা,এত লোক করেছে তো ভারতীর ভজনা।এর পরে বাঁশি যবে ফেলে যাব ধূলিতেতখন আমারে ভুলো পার যদি ভুলিতে।সেদিন নূতন কবি দক্ষিণপবনেমধুঋতু মুখরিবে তোমাদের স্তবনে—তখন আমার কোনে। কীটে-কাটা পাতাতেএকটা লাইনও যদি পারে মন মাতাতে

তা হলে হঠাৎ বুক উঠিবে যে কাঁপিয়াবৈতরণীতে যবে যাব খেয়া চাপিয়া॥

এ কী গেরো। কাজ কী এ কল্পনাবিহারে,সেণ্টিমেণ্টালিটি বলে লোকে ইহারে।ম’রে তবু বাঁচিবার আবদার খোকামি,সংসারে এর চেয়ে নেই ঘোর বোকামি।এটা তো আধুনিকার সহিবে না কিছুতেই;এসটিমেশনে তার পড়ে যাব নিচুতেই।অতএব, মন, তোর কলসি ও দড়ি আন্,অতলে মারিস ডুব মিড-ভিক্‌টোরিয়ান।কোনো ফল ফলিবে না আঁখিজল-সিচনে;শুকনো হাসিটা তবে রেখে যাই পিছনে।গদ্‌গদ সুর কেন বিদায়ের পাঠটায়,শেষ বেলা কেটে যাক ঠাট্টায় ঠাট্টায়॥

তোমাদের মুখে থাক্ হাস্যের রোশনাই—কিছু সীরিয়াস কথা বলি তবু, দোষ নাই।কখনো দিয়েছে দেখা হেন প্রভাশালিনী।শুধু এ-কালিনী নয়, যারা চিরকালিনী।

এ কথাটা ব’লে যাব মোর কন্‌শোনেইতাদের মিলনে কোনো ক্ষণিকের নেশা নেই।জীবনের সন্ধ্যায় তাহাদেরি বরণেশেষ রবিরেখা রবে সোনা-আঁকা স্মরণে।সুর-সুরধুনীধারে যে অমৃত উথলেমাঝে মাঝে কিছু তার ঝ'রে পড়ে ভূতলে,এ জনমে সে কথা জানার সম্ভাবন৷কেমনে ঘটিবে যদি সাক্ষাৎ পাব না।আমাদের কত ত্রুটি আসনে ও শয়নে,ক্ষমা ছিল চিরদিন তাহাদের নয়নে।প্রেমদীপ জ্বেলেছিল পুণ্যের আলোকে,মধুর করেছে তারা যত কিছু ভালোকে।নানারূপে ভোগসুধা যা করেছে বরষনতারে শুচি করেছিল সুকুমার পরশন।দামি যাহা মিলিয়াছে জীবনের এ পারেমরণের তীরে তারে নিয়ে যেতে কে পারে।তবু মনে আশা করি, মৃত্যুর রাতেওতাহাদেরি প্রেম যেন নিতে পারি পাথেয়।আর বেশি কাজ নেই, গেছে কেটে তিনকাল,যে কালে এসেছি আজ সে কালটা সিনিকাল।কিছু আছে যার লাগি সুগভীর নিশ্বাসজেগে ওঠে— ঢাকা থাক্ তার প্রতি বিশ্বাস॥

একটু সবুর করো, আরো কিছু বলে যাই,কথার চরম পারে তার পরে চলে যাই।যে গিয়েছে তার লাগি খুঁচিয়ো না চেতনা,ছায়ারে অতিথি ক'রে আসনটা পেতো না।বৎসরে বৎসরে শোক করা রীতিটারমিথ্যার ধাক্কায় ভিত ভাঙে স্মৃতিটার।ভিড় ক’রে ঘটা-করা ধরা-বাঁধা বিলাপেপাছে কোনো অপরাধ ঘটে প্রথা-খিলাপে,ভারতে ছিল না লেশ এই-সব খেয়ালের—কবি-'পরে ভার ছিল নিজ মেমোরিয়ালের।“ভুলিব না, ভুলিব না” এই ব’লে চীৎকারবিধি না শোনেন কভু, বলো তাহে হিত কার।যে ভোলা সহজ ভোলা নিজের অলক্ষ্যেসে-ই ভালো হৃদয়ের স্বাস্থ্যের পক্ষে।শুষ্ক উৎস খুঁজে মরুমাটি খোঁড়াটা,তেলহীন দীপ লাগি দেশালাই পোড়াটা,যে-মোষ কোথাও নেই সেই মোষ তাড়ানো,কাজে লাগিবে না যাহা সেই কাজ বাড়ানো—শক্তির বাজে ব্যয় এরে কয় জেনে। হে,উৎসাহ দেখাবার সদুপায় এ নহে।মনে জেনো জীবনটা মরণেরই যজ্ঞ—স্থায়ী যাহা, আর যাহা থাকার অযোগ্য,

সকলি আহুতিরূপে পড়ে তারি শিখাতে,টিকে না যা কথা দিয়ে কে পারিবে টিকাতে।ছাই হয়ে গিয়ে তবু বাকি যাহা রহিবেআপনার কথা সে তো আপনিই কহিবে॥