দ্বিতীয় দৃশ্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

শারদোৎসব

আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়লুকোচুরি খেলা।নীল আকাশে কে ভাসালেসাদা মেঘের ভেলা।

আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে,উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে—আজ কিসের তরে নদীর চরেচখাচখির মেলা।

ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই,যাব না আজ ঘরে।ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজনেব রে লুঠ করে।যেন জোয়ার-জলে ফেনার রাশিবাতাসে আজ ছুটছে হাসি,আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশিকাটবে সকল বেলা।

আনন্দেরই সাগর থেকেএসেছে আজ বান।দাঁড় ধ’রে আজ বোস্ রে সবাই,টান্ রে সবাই টান্।বোঝা যত বোঝাই করিকরব রে পার দুখের তরী,ঢেউয়ের ’পরে ধরব পাড়ি,যায় যদি যাক প্রাণ।কে ডাকে রে পিছন হতে,কে করে রে মানা।

ভয়ের কথা কে বলে আজ,ভয় আছে সব জানা।কোন্ শাপে কোন্ গ্রহের দোষেসুখের ডাঙায় থাকব বসে?পালের রসি ধরব কষি,চলব গেয়ে গান।

তোমার সোনার থালায় সাজাব আজদুখের অশ্রুধার।জননী গো, গাঁথব তোমারগলার মুক্তাহার।চন্দ্রসূর্য পায়ের কাছেমালা হয়ে জড়িয়ে আছে,তোমার বুকে শোভা পাবে আমার

দুখের অলংকার।ধন ধান্য তোমারই ধন,কী করবে তা কও।দিতে চাও তো দিয়ো আমায়,নিতে চাও তো লও।দুঃখ আমার ঘরের জিনিস,খাঁটি রতন তুই তো চিনিস—তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিসএ মোর অহংকার।

রাজরাজেন্দ্র জয় জয়তু জয় হে!ব্যাপ্ত পরতাপ তব বিশ্বময় হে!দুষ্টদলদলন তব দণ্ড ভয়কারী,শত্রুজনদর্পহর দীপ্ত তরবারী,সংকটশরণ্য তুমি দৈন্যদুখহারী,মুক্ত-অবরোধ তব অভ্যুদয় হে।

নব কুন্দধবলদল-সুশীতলা,অতি সুনির্মলা, সুখসমুজ্জ্বলা,শুভ সুবর্ণ-আসনে অচঞ্চলা।স্মিত উদয়ারুণ-কিরণ-বিলাসিনী,পূর্ণসিতাংশু-বিভাস-বিকাশিনীনন্দনলক্ষ্মী সুমঙ্গলা।

অক্ষি দুঃখোত্থিতস্যৈব সুপ্রসন্নে কনীনিকে।আংক্তে চাদ্‌গণং নাস্তি ঋভূনাং তন্নিবোধত।কনকাভানি বাসাংসি অহতানি নিবোধত।অন্নমশ্নীত মৃজ‍্মীত অহং বো জীবনপ্রদঃ।এতা বাচঃ প্রযুজ্যন্তে শরদযত্রোপদৃশ্যতে।

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরাগেঁথেছি শেফালিমালা।নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়েসাজিয়ে এনেছি ডালা।এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমারশুভ্র মেঘের রথে,এসো নির্মল নীল পথে,এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমলবনগিরি-পর্বতে।এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদলশীতল শিশির-ঢালা।ঝরা মালতীর ফুলেআসন বিছানো নিভৃত কুঞ্জেভরা গঙ্গার কূলেফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারেতোমার চরণমূলে।গুঞ্জরতান তুলিয়ো তোমারসোনার বীণার তারে

মৃদু মধু ঝংকারে,হাসিঢালা সুর গলিয়া পড়িবেক্ষণিক অশ্রুধারে।রহিয়া রহিয়া যে পরশমণিঝলকে অলককোণেপলকের তরে সকরুণ করেবুলায়ো বুলায়ো মনে—সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,আঁধার হইবে আলা।

লেগেছে অমল ধবল পালেমন্দ মধুর হাওয়া।দেখি নাই কভু দেখি নাইএমন তরণী বাওয়া।কোন্ সাগরের পার হতে আনেকোন্ সুদূরের ধন!ভেসে যেতে চায় মন—ফেলে যেতে চায় এই কিনারায়সব চাওয়া সব পাওয়া।

পিছনে ঝরিছে ঝরো ঝরো জল,গুরু গুরু দেয়া ডাকে—মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণছিন্ন মেঘের ফাঁকে।ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কারহাসিকান্নার ধন—

ভেবে মরে মোর মন—কোন্ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র,কী মন্ত্র হবে গাওয়া!

আমার নয়ন-ভুলানো এলে!আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে!

আমার নয়ন-ভুলানো এলে!আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে!শিউলিতলার পাশে পাশেঝরা ফুলের রাশে রাশেশিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসেঅরুণ-রাঙা চরণ ফেলেনয়ন-ভুলানো এলে!

আলোছায়ার আঁচলখানিলুটিয়ে পড়ে বনে বনে,ফুলগুলি ঐ মুখে চেয়েকী কথা কয় মনে মনে।তোমায় মোরা করব বরণ,মুখের ঢাকা করো হরণ—ওইটুকু ওই মেঘাবরণদু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে!নয়ন-ভুলানো এলে!

বনদেবীর দ্বারে দ্বারেশুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,আকাশবীণার তারে তারেজাগে তোমার আগমনী।কোথায় সোনার নূপুর বাজে—বুঝি আমার হিয়ার মাঝেসকল ভাবে সকল কাজেপাষাণ-গলা সুধা ঢেলে!নয়ন-ভুলানো এলে!