শিশুর জীবন
শিশু ভোলানাথ
ছোটো ছেলে হওয়ার সাহসআছে কি এক ফোঁটা,তাই তো এমন বুড়ো হয়েই মরি।তিলে তিলে জমাই কেবল,জমাই এটা ওটা,পলে পলে বাক্স বোঝাই করি।কালকে-দিনের ভাব্না এসেআজ দিনেরে মারলে ঠেসে,কাল তুলি ফের পরদিনের বোঝা।সাধের জিনিস ঘরে এনেইদেখি এনে ফল কিছু নেই—খোঁজের পরে আবার চলে খোঁজা।
ভবিষ্যতের ভয়ে ভীতদেখতে না পাই পথ,তাকিয়ে থাকি পরশুদিনের পানে।
ভবিষ্যৎ তো চিরকালইথাকবে ভবিষ্যৎ,ছুটি তবে মিলবে বা কোন্খানে?বুদ্ধিদীপের আলো জ্বালি,হাওয়ায় শিখা কাঁপছে খালি—হিসেব ক’রে পা টিপে পথ হাঁটি।মস্ত্রণা দেয় কতজনা—সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনা,পদে পদে হাজার খুঁটিনাটি।
শিশু হবার ভরসা আবারজাগুক আমার প্রাণে,লাগুক হাওয়া নির্ভাবনার পালে,ভবিষ্যতের মুখোশখানাখসাব এক টানে,দেখব তারেই বর্তমানের কালে।ছাদের কোণে পুকুর-পাড়েজানব নিত্য-অজানারে,মিশিয়ে রবে অচেনা আর চেনা;জমিয়ে ধুলো সাজিয়ে ঢেলাতৈরি হবে আমার খেলা,সুখ রবে মোর বিনামূল্যেই কেনা।
বড়ো হবার দায় নিয়ে এইবড়োর হাটে এসেনিত্য চলে ঠেলাঠেলির পালাযাবার বেলায় বিশ্ব আমারবিকিয়ে দিয়ে শেষেশুধুই নেব ফাঁকা কথার ডালা!কোন্টা সস্তা কোন্টা দামীওজন করতে গিয়ে আমিবেলা আমার বইয়ে দেব দ্রুত—সন্ধ্যা যখন আঁধার হবেহঠাৎ মনে লাগবে তবেকোনোটাই না হল মনঃপূত।
বাল্য দিয়ে যে জীবনেরআরম্ভ হয় দিনবাল্যে আবার হোক-না তাহা সারা।জলে স্থলে সঙ্গ আবারপাক্-না বাঁধন-হীন,ধুলায় ফিরে আসুক-না পথহারা।সম্ভাবনার ডাঙা হতেঅসম্ভবের উতল স্রোতেদিই-না পাড়ি স্বপন-তরী নিয়ে।
আবার মনে বুঝি-না এইবস্তু ব’লে কিছুই তো নেই—বিশ্ব গড়া যা-খুশি-তাই দিয়ে
প্রথম যেদিন এসেছিলেমনবীন পৃথ্বীতলেরবির আলোয় জীবন মেলে দিয়ে,সে যেন কোন্ জগৎ-জোড়াছেলেখেলার ছলে,কোথাথ্থেকে কেই বা জানে কী এ!শিশির যেমন, রাতে রাতেকে যে তারে লুকিয়ে গাঁথে—ঝিল্লি বাজায় গোপন ঝিনিঝিনি!ভোরবেলা যেই চেয়ে দেখি,আলোর সঙ্গে আলোর এ কীইশারাতে চলছে চেনাচিনি!
সেদিন মনে জেনেছিলেম,নীল আকাশের পথেছুটির হাওয়ায় ঘুর লাগালো বুঝি!
যা-কিছু সব চলেছে ওইছেলেখেলার রথেযে যার আপন দোসর খুঁজি খুঁজি।গাছে খেলা ফুল-ভরানো,ফুলে খেলা ফল-ধরানো,ফলের খেলা অঙ্কুরে অঙ্কুরে।স্থলের খেলা জলের কোলে,জলের খেলা হাওয়ার দোলে,হাওয়ার খেলা আপন বাঁশির সুরে।
ছেলের সঙ্গে আছ তুমিনিত্য ছেলেমানুষনিয়ে তোমার মাল-মসলার ঝুলি।আকাশেতে ওড়াও তোমারকতরকম ফানুস,মেঘে বোলাও রঙ-বেরঙের তুলি।সেদিন আমি আপন-মনেফিরেছিলেম তোমার সনে,খেলেছিলেম হাত মিলিয়ে হাতে।ভাসিয়েছিলেম রাশি রাশিকথায়-গাঁথা কান্না হাসিতোমারই সব ভাসান খেলার সাথে।
ঋতুর তরী বোঝাই কররঙিন ফুলে ফুলে,কালের স্রোতে যায় তারা সব ভেসেআবার তারা ঘাটে লাগেহাওয়ায় দুলে দুলেএই ধরণীর কূলে কূলে এসে।মিলিয়েছিলেম বিশ্বডালায়তোমার ফুলে আমার মালায়,সাজিয়েছিলেম ঋতুর তরণীতে—আশা আমার আছে মনে,বকুল কেয়া শিউলি-সনেফিরে ফিরে আসবে ধরণীতে।
সেদিন যখন গান গেয়েছিআপন-মনে নিজে,বিনা কাজে দিন গিয়েছে চলে,তখন আমি চোখে তোমারহাসি দেখেছি যে—চিনেছিলে আমায় সাথি ব’লে।তোমার ধুলো তোমার আলোআমার মনে লাগত ভালো,শুনেছিলেম উদাস-করা বাঁশি।
বুঝেছিলে সে ফাল্গুনেআমার সে গান শুনে শুনেতোমারও গান আমি ভালোবাসি।
দিন গেল, ওই মাঠে বাটেআঁধার নেমে প’ল;এ পার থেকে বিদায় মেলে যদিতবে তোমার সন্ধেবেলারখেয়াতে পাল তোলো,পার হব এই হাটের ঘাটের নদী।আবার ওগো শিশুর সাথি,শিশুর ভুবন দাও তো পাতি,করব খেলা তোমায় আমায় একা।চেয়ে তোমার মুখের দিকেতোমায়— তোমার জগৎটিকে—সহজ চোখে দেখব সহজ দেখা।