তীর্থযাত্রিণী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সেঁজুতি

তীর্থের যাত্রিণী ও যে, জীবনের পথেশেষ আধক্রোশটুকু টেনে টেনে চলে কোনোমতে।হাতে নাম-জপ ঝুলি,পাশে তার রয়েছে পুঁটুলি।ভোর হতে ধৈর্য ধরি’ বসি’ ইস্টেশনেঅস্পষ্ট ভাবনা আসে মনে,আর কোনো ইস্টেশনে আছে যেন আর কোনো ঠাঁই,যেথা সব ব্যর্থতাইআপনায়হারানো অর্ঘ্যেরে ফিরে পায়,যেথা গিয়ে ছায়াকোনো এক রূপ ধরি’ পায় যেন কোনো এক কায়া।বুকের ভিতরে ওর পিছু হতে দেয় দোল,আশৈশব-পরিচিত দূর সংসারের কলরোল।প্রত্যাখ্যাত জীবনের প্রতিহত আশা,অজানার নিরুদ্দেশে প্রদোষে খুঁজিতে চলে বাসা।

যে পথে সে করেছিল যাত্রা একদিনসেখানে নবীনআলােকে, আকাশ ওর মুখ চেয়ে উঠেছিল হেসে।সে পথে পড়েছে আজ এসেঅজানা লােকের দল,তাদের কণ্ঠের ধ্বনি ওর কাছে ব্যর্থ কোলাহল।যে যৌবনখানিএকদিন পথে যেতে বল্লভেরে দিয়েছিল আনিমধুমদিরার রসে বেদনার নেশা।দুঃখে সুখে মেশা,সে রসের রিক্ত পাত্রে আজ শুষ্ক অবহেলা,মধুপগুঞ্জনহীন যেন ক্লান্ত হেমন্তের বেলা।

আজিকে চলেছে যারা খেলার সঙ্গীর আশেওরে ঠেলে যায় পথপাশে;যে খুঁজিছে দুর্গমের সাথীও পারে না তার পথে জ্বালাইতে বাতিজীর্ণ কম্পমান হাতেদুর্যোগের রাতে।একদিন যারা সবে এ পথ নির্মাণেলেগেছিল আপনার জীবনের দানে,

ও ছিল তাদেরি মাঝেনানা কাজে,সে পথ উহার আজ নহে।সেথা আজি কোন্ দূত কী বারতা বহেকোন্ লক্ষ্য পানেনাহি জানে।পরিত্যক্ত একা বসি’ ভাবিতেছে পাবে বুঝি দূরেসংসারের গ্লানি ফেলে স্বর্গ-ঘেঁষা দুর্মূল্য কিছুরে।হায় সেই কিছুযাবে ওর আগে আগে প্রেতসম, ও চলিবে পিছুক্ষীণালোকে, প্রতিদিন ধরি-ধরি করি’ তারেঅবশেষে মিলাবে আঁধারে।