পলায়নী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সেঁজুতি

যে পলায়নের অসীম তরণীবাহিছে সূর্যতারাসেই পলায়নে দিবসরজনীছুটেছ গঙ্গাধারা।চিরধাবমান নিখিল বিশ্বএ পলায়নের বিপুল দৃশ্য,এই পলায়নে ভূত ভবিষ্যদীক্ষিছে ধরণীরে।জলের ছায়া সে দ্রুততালে বয়,কঠিন ছায়া সে ঐ লোকালয়,একই প্রলয়ের বিভিন্ন লয়।স্থিরে আর অস্থিরে॥

সৃষ্টি যখন আছিল নবীননবীনতা নিয়ে এলে।ছেলেমানুষির স্রোতে নিশিদিনচলো অকারণ খেলে।লীলাছলে তুমি চির পথহারা,বন্ধনহীন নৃত্যের ধারা,তোমার কূলেতে সীমা দিয়ে কা’রাবাঁধন গড়িছে মিছে।আবাঁধা ছন্দে হেসে যাও সরি’পাথরের মুঠি শিথিলিত করি’,বাঁধা ছন্দের নগরনগরীধুলায় মিলায় পিছে॥

অচঞ্চলের অমৃত বরিষেচঞ্চলতার নাচে।বিশ্বলীলা তো দেখি কেবলি সেনেই নেই ক’রে আছে।ভিত ফেঁদে যারা তুলিছে দেয়ালতা’রা বিধাতার মানে না খেয়াল,তা’রা বুঝিল না,—অনন্তকালঅচির কালেরই মেলা।

বিজয় তোরণ গাঁথে তা’রা যতআপনার ভারে ভেঙে পড়ে তত,খেলা করে কাল বালকের মতোল’য়ে তার ভাঙা ঢেলা॥

ওরে মন, তুই চিন্তার টানেবাঁধিস নে আপনারে,এই বিশ্বের সুদূর ভাসানেঅনায়াসে ভেসে যা রে।কী গেছে তোমার কী হয়েছে আরনাই ঠাঁই তার হিসাব রাখার,কী ঘটিতে পারে জবাব তাহারনাইবা মিলিল কোনো।ফেলিতে ফেলিতে যাহা ঠেকে হাতে,তাই পরশিয়া চলে দিনে রাতে,যে সুর বাজিল মিলাতে মিলাতেতাই কান দিয়ে শোনো।

এর বেশি যদি আরো কিছু চাওদুঃখই তাহে মেলে।যেটুকু পেয়েছ তাই যদি পাওতাই নাও, দাও ফেলে।

যুগ যুগ ধরি’ জেনো মহাকালচলার নেশায় হয়েছে মাতাল,ডুবিছে ভাসিছে আকাশ পাতালআলোক আঁধার বহি’।দাঁড়াবে না কিছু তব আহ্বানে,ফিরিয়া কিছু না চাবে তোমা পানে,ভেসে যদি যাও যাবে একখানেসকলের সাথে রহি’॥