অনাদৃত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সোনার তরী

তখন তরুণ রবি প্রভাত কালেআনিছে ঊষার পূজা সোনার থালে।সীমাহীন নীল জলকরিতেছে থলথল,রাঙা রেখা জ্বলজ্বলকিরণ মালে।তখন উঠিছে রবি গগন ভালে।

গাঁথিতেছিলাম জাল বসিয়া তীরে।বারেক অতল পানে চাহিনু ধীরে;শুনিনু কাহার বাণী,পরাণ লইল টানি’,যতনে সে জালখানিতুলিয়া শিরেঘুরায়ে ফেলিয়া দিনু সুদূর নীরে।

নাহি জানি কত কি যে উঠিল জালে!কোনটা হাসির মত কিরণ ঢালে,কোনটা বা টলটলকঠিন নয়ন জল,কোনটা সরম ছলবধূর গালে!সে দিন সাগর তীরে প্রভাত কালে!

বেলা বেড়ে ওঠে, রবি ছাড়ি’ পূরবেগগনের মাঝখানে ওঠে গরবে।ক্ষুধা তৃষ্ণা সব ভুলি’জাল ফেলে টেনে তুলি,উঠিল গোধূলি ধূলিধূসর নভে।গাভীগণ গৃহে ধায় হরষ রবে।

লয়ে দিবসের ভার ফিরিনু ঘরে,তখন উঠিছে চাঁদ আকাশ পরে।গ্রামপথে নাহি লোক,পড়ে’ আছে ছায়ালোক,মুদে আসে দুটি চোখস্বপন ভরে;ডাকিছে বিরহী পাখী কাতর স্বরে।

সে তখন গৃহকাজ সমাধা করি’কাননে বসিয়াছিল মালাটি পরি’কুসুম একটি দুটিতরু হতে পড়ে টুটি’,সে করিছে কুটিকুটিনখেতে ধরি’;আলসে আপন মনে সময় হরি’।

বারেক আগিয়ে যাই বারেক পিছু।কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম নয়ন নীচু।যা ছিল চরণে রেখেভূমিতল দিমু ঢেকে;সে কহিল দেখে’ দেখে’“চিনিনে কিছু!”শুনি’ রহিলাম শির করিয়া নীচু!

ভাবিলাম, সারাদিন সারাটি বেলাবসে’ বসে’ করিয়াছি কি ছেলেখেলা!না জানি কি মোহে ভুলে’গেনু অকুলের কূলে,ঝাঁপ দিয়ে কুতূহলেআনিনু মেলাঅজানা সাগর হতে অজানা ঢেলা!

যুঝি নাই, খুঁজি নাই হাটের মাঝে,এমন হেলার ধন দেওয়া কি সাজে?কোন দুখ নাহি যার,কোন তৃষা বাসনার,এ সব লাগিবে তারকিসের কাজে?কুড়ায়ে লইনু পুন মনের লাজে!

সারাটি রজনী বসি দুয়ার দেশেএকে একে ফেলে দিনু পথের শেষে!সুখহীন ধনহীনচলে গেনু উদাসীন;প্রভাতে পরের দিনপথিকে এসে’সব তুলে’ নিয়ে গেল আপন দেশে!