গানভঙ্গ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সোনার তরী

গাহিছে কাশিনাথ নবীন যুবাধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি’,কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুরসাতটি যেন পোষা পাখী।শাণিত তরবারি গলাটি যেননাচিয়া ফিরে দশদিকে,কখন্ কোথা যায় না পাই দিশা,বিজুলি-হেন ঝিকিমিকে।আপনি গড়ি’ তোলে বিপদজালআপনি কাটি’ দেয় তাহা।সভার লোকে শুনে অবাক্‌ মানেসঘনে বলে বাহা বাহা!

কেবল বুড়া রাজা প্রতাপ রায়কাঠের মত বসি আছে।বরজলাল ছাড়া কাহারো গানভাল না লাগে তার কাছে।বালকবেলা হ’তে তাহারি গীতেদিল সে এতকাল যাপি’,বাদল দিনে কত মেঘের গান,হোলির দিনে কত কাফি!

গেয়েছে আগমনী শরৎপ্রাতে,গেয়েছে বিজয়ার গান,হৃদয় উছসিয়া অশ্রুজলেভাসিয়া গেছে দুনয়ান।যখনি মিলিয়াছে বন্ধুজনেসভার গৃহ গেছে পূরে,গেয়েছে গোকুলের গোয়াল-গাথাভূপালী মূলতানী সুরে।ঘরেতে বারবার এসেছে কতবিবাহ-উৎসব রাতি,পরেছে দাসদাসী লোহিত বাসজ্বলেছে শত শত বাতি,বসেছে নব বর সলাজ মুখেপরিয়া মণি-আভরণ,করিছে পরিহাস কানের কাছেসমবয়সী প্রিয়জন,সামনে বসি তার বরজলালধরেছে সাহানার সুর;—সে সব দিন আর সে সব গানহৃদয়ে আছে পরিপূর।সে ছাড়া কারো গান শুনিলে তাইমর্ম্মে গিয়ে নাহি লাগে,অতীত প্রাণ যেন মন্ত্রবলেনিমেষে প্রাণে নাহি জাগে।

প্রতাপ রায় তাই দেখিছে শুধুকাশির বৃথা মাথানাড়া,সুরের পরে সুর ফিরিয়া যায়হৃদয়ে নাহি পায় সাড়া।

থামিল গান যবে, ক্ষণেক তরেবিরাম মাগে কাশিনাথ।বরজলাল পানে প্রতাপ রায়হাসিয়া করে আঁখিপাত।কানের কাছে তার রাখিয়া মুখ,কহিল, “ওস্তাদ জি,গানের মত গান শুনায়ে দাও,এবে কি গান বলে, ছি!এ যেন পাখী লয়ে বিবিধ ছলেশিকারী বিড়ালের খেলা!সেকালে গান ছিল একালে হায়গানের বড় অবহেলা!”

বরজলাল বুড়া শুক্লকেশশুভ উষ্ণীষ শিরে,বিনতি করি’ সবে, সভার মাঝেআসন নিল ধীরে ধীরে।শিরা-বাহির-করা শীর্ণ করেতুলিয়া নিল তানপুব,

ধরিল নতশিরে নয়ন মুদি’ইমনকল্যাণ সুর।কাঁপিয়া ক্ষীণ স্বর মরিয়া যায়বৃহৎ সভাগৃহকোণে,ক্ষুদ্র পাখী যথা ঝড়ের মাঝেউড়িতে নারে প্রাণপণে।বসিয়া বামপাশে প্রতাপ রায়দিতেছে শত উৎসাহ-“আহাহা, বাহা বাহা!”-কহিছে কানে“গলা ছাড়িয়া গান গাহ!”

সভার লোকে সবে অন্যমনা,কেহ বা কানাকানি করে।কেহ বা তোলে হাই, কেহ বা ঢোলে,কেহ বা চলে’ যায় ঘরে।“ওরে রে আয় লয়ে তামাকু পান”ভৃত্যে ডাকি কেহ কয়।সঘনে পাখা নাড়ি’ কেহ বা বলে“গরম আজি অতিশয়।”করিছে আনাগোনা ব্যস্ত লোক,ক্ষণেক নাহি রহে চুপ;নীরব ছিল সভা, ক্রমশ সেথাশব্দ উঠে শতরূপ।

বুড়ার গান তাহে ডুবিয়া যায়,তুফান মাঝে ক্ষীণ তরি;কেবল দেখা যায় তানপুরায়আঙ্গুল কাঁপে থরথরি।হৃদয়ে যেথা হ’তে গানের সুরউছসি উঠে নিজ সুখেহেলার কলরব শিলার মতচাপে সে উৎসের মুখে।কোথায় গান আর কোথায় প্রাণ,দু’দিকে ধায় দুইজনে,তবুও রাখিবারে প্রভুর মানবরজ গায় প্রাণপণে।

গানের এক পদ মনের ভ্রমেহারায়ে গেল কি করিয়া!আবার তাড়াতাড়ি ফিরিয়া গাহেলইতে চাহে শুধরিয়া।আবার ভুলে’ যায়, পড়ে না মনে,সরমে মস্তক নাড়ি’আবার শুরু হতে ধরিল গানআবার ভুলি দিল ছাড়ি’।দ্বিগুণ থরথরি কাঁপিছে হাত,স্মরণ করে গুরুদেবে।

কণ্ঠ কাঁপিতেছে কাতরে, যেনবাতাসে দীপ নেবে-নেবে।গানের পদ তবে ছাড়িয়া দিয়ারাখিল সুরটুকু ধরি’,সহসা হাহা রবে উঠিল কাঁদিগাহিতে গিয়ে হা-হা করি’!কোথায় দূরে গেল সুরের খেলা,কোথায় তাল গেল ভাসি’,গানের সুতা ছিঁড়ি’ পড়িল খসি’অশ্রু-মুকুতার রাশি।কোলের সখী তানপুরার পরেরাখিল লজ্জিত মাথা,ভুলিল শেখা গান, পড়িল মনেবাল্য ক্রন্দন-গাথা।নয়ন ছলছল প্রতাপ রায়কর বুলায় তার দেহে।“আইস, হেথা হ'তে আমরা যাই,”কহিল সকরুণ স্নেহে।শতেক দীপজ্বালা’ নয়ন-ভরাছাড়ি সে উৎসব ঘরবাহিরে গেল দু’টি প্রাচীন সখাধরিয়া দুঁহু দোঁহা কর।

বরজ করযোড়ে কহিল, প্রভু,মোদের সভা হ’ল ভঙ্গ।এখন আসিয়াছে নূতন লোকধরায় নব নব রঙ্গ।জগতে আমাদের বিজন সভাকেবল তুমি আর আমি।সেথায় আনিয়োনা নূতন শ্রোতা,মিনতি তব পদে স্বামি!একাকী গায়কের নহে ত গান,মিলিতে হবে দুইজনে!গাহিবে এক জন খুলিয়া গলা,আরেক জন গাবে মনে!তটের বুকে লাগে জলের ঢেউতবে সে কলতান উঠে,বাতাসে বন-সভা শিহরি’ কাঁপেতবে সে মর্ম্মর ফুটে!জগতে যেথা যত রয়েছে ধ্বনিযুগল মিলিয়াছে আগে।যেথানে প্রেম নাই বোবার সভা,সেখানে গান নাহি জাগে।