সুপ্তোত্থিতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সোনার তরী

ঘুমের দেশে ভাঙ্গিল ঘুম,উঠিল কলস্বর।গাছের শাথে জাগিল পাখীকুসুমে মধুকর।

অশ্বশালে জাগিল ঘোড়াহস্তীশালে হাতী।মল্লশালে মল্ল জাগি’ফুলায় পুন ছাতি।

জাগিল পথে প্রহরী দল,দুয়ারে জাগে দ্বারী,আকাশে চেয়ে নিরখে বেলাজাগিয়া নর নারী।

উঠিল জাগি’ রাজাধিরাজু,জাগিল রাণীমাতা।কচালি’ আঁখি কুমার সাথেজাগিল রাজভ্রাতা।

নিভৃত ঘরে ধূপের বাস,রতন দীপ জ্বালা,জাগিয়া উঠি’ শয্যাতলেসুধাল রাজবালা——কে পরালে মালা!

খসিয়া-পড়া আঁচলখানিবক্ষে তুলি’ দিল।আপন-পানে নেহারি’ চেয়েসরমে শিহরিল!

ত্রস্ত হয়ে চকিত-চোখেচাহিল চারিদিকে;বিজন গৃহ, রতন দীপজ্বলিছে অনিমিখে!

গলার মালা খুলিয়া লয়েধরিয়া দুটি করেসোনার সুতে যতনে গাঁথালিখনখানি পড়ে।

পড়িল নাম, পড়িল ধাম,পড়িল লিপি তার,কোলের পরে বিছায়ে দিয়েপড়িল শতবার!

শয়নশেষে রহিল বসে’ভাবিল রাজবালা——আপন ঘরে ঘুমায়ে ছিনুনিতান্ত নিরালাকে পরালে মালা!—

নূতন-জাগা কুঞ্জবনেকুহরি উঠে পিক,বসন্তের চুম্বনেতেবিবশ দশ দিক্‌!

বাতাস ঘরে প্রবেশ করেব্যাকুল উচ্ছ্বাসে,নব কুসুম মঞ্জরীরগন্ধ লয়ে আসে।

জাগিয়া উঠি বৈতালিকগাহিছে জয়গান,প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরেবাঁশিতে উঠে তান।

শীতল ছায়া নদীর পথেকলসে লয়ে বারি—কাঁকন বাজে নুপুর বাজেচলিছে পুরনারী।

কাননপথে মর্ম্মরিয়াকাঁপিছে গাছপালা,আধেক মুদি’ নয়ন দুটিভাবিছে রাজবালা—কে পরালে মালা!

বারেক মালা গলায় পরে,বারেক লহে খুলি’,দুইটি করে চাপিয়া ধরেবুকের কাছে তুলি’।

শয়ন পরে মেলায়ে দিয়েতৃষিত চেয়ে রয়,এমনি করে’ পাইবেযেন অধিক পরিচয়।

জগতে আজ কত-না ধ্বনিউঠিছে কত ছলে,একটি আছে গোপন কথা,সে কেহ নাহি বলে!

বাতাস শুধু কানের কাছেবহিয়া যায় হূহু,কোকিল শুধু অবিশ্রামডাকিছে কুহু কুহু।

নিভৃত ঘরে পরান মনএকান্ত উতালা,শয়নশেষে নীরবে বসে’ভাবিছে রাজবালা—কে পরালে মালা!

কেমন বীর-মুরতি তারমাধুরী দিয়ে মিশা!দীপ্তিভরা নয়ন মাঝেতৃপ্তিহীন তৃষা!

স্বপ্নে তারে দেখেছে যেনএমনি মনে লয়,—ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধুঅসীম বিস্ময়!

পারশে যেন বসিয়াছিল,ধরিয়াছিল কর,এখনো তার পরশে যেনসরস কলেবর!

চমকি’ মুখ দু’হাতে ঢাকে,শরমে টুটে মন,লজ্জাহীন প্রদীপ কেননিভে নি সেই ক্ষণ!

কণ্ঠ হতে ফেলিল হারযেন বিজুলিজ্বালা,শয়ন পরে লুটায়ে পড়ে'ভাবিল রাজবালা—কে পরালে মালা!

এমনি ধীরে একটি করেকাটিছে দিন রাতি।বসন্ত সে বিদায় নিললইয়া যূথী জাতি।

সঘন মেঘে বরষা আসে,বরষে ঝর ঝর্‌।কাননে ফুটে নবমালতীকদম্ব কেশর।

স্বচ্ছ হাসি শরৎ আসেপূর্ণিমা-মালিকা।সকল বন আকুল করেশুভ্র শেফালিকা।

আসিল শীত সঙ্গে লয়েদীর্ঘ দুখ-নিশা।শিশির-ঝরা কুন্দ ফুলেহাসিয়া কাঁদে দিশা।

ফাগুন মাস আবার এলবহিয়া ফুলডালা।জানালা পাশে একেলা বসেভাবিছে রাজবালা—কে পরালে মালা!