তত্ত্ববিচার
জননী, জগৎমোহিনী, জীব-নিস্তারিণী;ও মা তোমারি মহিমা, কে করিবে সীমা,অনাদ্যা তুমি মা অনন্তরূপিণী॥
তোমারি মায়াতে ব্রহ্মাণ্ড বিকাশ,বিশ্ব বায়ু বারি বহ্নি কি আকাশ,যেখানে যা দেখি তোমারি প্রকাশ—জননী গো—সত্তারূপে তুমি জ্ঞানদায়িনী॥
রবি নিশাকর নক্ষত্রনিকর,আকাশে প্রকাশে হাসে মনোহর,দেখিতে তোমায় ভ্রমে নিরম্ভর—অরূপিণি—অনন্ত অম্বর চিত্রকারিণী।
দেখিতে তোমায় সাগরাম্বুরাশি,উত্তাল তরঙ্গে ধার দিবানিশি,বলে রাশি রাশি, কুসুম হাঁসি হাঁসি—চেয়ে রয় গো-দেখিবার তরে আমার তারিণী॥
প্রবল পবন দেশে দেশে ধায়,আনন্দে মাতিয়া তব গুণ গায়,তরু লতা পাতা সবারে নাচায়—দেখি তায় গো—আপনি নাচিয়া কাঁপাঁয় মেদিনী॥
চিন্তাময়ী তারা ব্যাপ্ত চরাচরে,তবু না চিনিলাম চিন্ময়ী মা তোরে,গুপ্ত রূপে পরিব্রাজকের অন্তরে—দেখা দে মা—মদনমর্দ্দন-মনোহারিণী॥
দৈবী হোষা গুণময়ী মম সায়া দুরত্যয়া।মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেডাং তরন্তি তে॥
“সৎসঙ্গশ্চ বিবেকশ্চ নির্ম্মলং নয়নদ্বয়ম্।যস্য নাস্তি নরঃ সোহন্ধঃ কথং নাপদমার্গগঃ॥”
“সচ্ছিদ্রঃ ছিদ্রয়তান্যাং সূচীব খলদুর্ম্মু খঃ।পশ্চাচ্চ সুঅবৎ সাধু পরচ্ছিদ্রং বিলুষ্পতি॥”
“আয়রে মাধাই! কাছে আয়,হরিনামের বাতাস লাণ্ডক গায়।”
“পীত্বা মোহময়ীং প্রমোদমদিরাং উন্মত্তভূতং জগৎ॥”
“যদগত্বা ন নিবর্ত্তন্তে তদ্ধান পরমন্মম”।
জাগরে নিদ্রিত জীব ঘুমাইবে আরও কত।চেতন হয়ে দেখ চেয়ে শিয়রে কাল সমাগত॥পেয়েছ মনুষ্য-কায়া, ত্যজরে বিষয় মায়া,লয়ে মিথ্যা সুতজায়া, দিনে দিনে দিন গত॥কুবাসন পরিহরি, সদা বল হরি হরি,বহিবে প্রেমলহরী হৃদে অবিরত॥পূর্ণ হবে সব কামনা, রবে না আর ভয় ভাবনা,পরিব্রাজকের রসনা, হরিগুণ গাও সতত॥
(সুর “নির্ম্মল সলিলে বহিছ সদা তটশালিনী সুন্দরী যমুনে ও”)চঞ্চল মানস বিনাশ আশাপাশ বিরস বিলাসবাসনা রে।বিষয়বিভবে, মত্ত কি হইলে, ভুলিলে ভুলিলে আপনারে;আসিয়া জগতে, অীরোহি মনোরথে, ভ্রমছ কি ভাবে ভাব না রে॥দেখিতে দেখিতে, কাল প্রবাহে, জীবন যৌবন যাইল রে।ক্রমে ধীরে ধীরে, গভীর কালনীরে, ডুবিবে তাকি মন জান না রে॥কা তব কান্তা, কস্তে পুত্র, কস্য ত্বং বা ব্রহ্মবিচারে;চিন্তয় কোহহং কথং জগদিদং, কেন কৃতা বিশ্ব-রচনা রে॥ভূমানুসন্ধান, কর মূঢ় মন, মলিন বাসন রবে না রে।হও ধ্যাননিরত, তুর্য্যাবস্থাগত, কুরু চিংস্বরূপম্ ধারণা রে॥
শান্তিসিন্ধুজলে, হইবে শীতল, বাজিবে প্রেম রাজসদনে রে;ভেদবুদ্ধি যাবে ব্রহ্মস্বরূপ হবে, রবে না, ভাবনা যাতনা রে॥গাও পরিব্রাজক, প্রেমময় নাম, প্রেম-বাতাসে প্রাণ জুড়াবে রে;প্রেম-সুধাপানে হয়ে মাতোয়ারা, রবে না তনু-মন চেতন রে॥
তোমার ভুবনভরা রূপটি একবার দেখে লই মা নয়নে॥অন্নপূর্ণা তুমি মা, তুমি শ্মশানে শ্যামা,কৈলাসেতে উমা, তুমি বৈকুণ্ঠে রমা;–ধর বিরিঞ্চি শিব বিষ্ণুরূপ, সৃজন লয় পালনে॥তুমি পুরুষ কি নারী, তত্ত্ব বুঝিতে নারি,তুমি স্বয়ং না বুঝালে তাকি বুঝিতে পারি;–তুমি আধা রাধা আধা কৃষ্ণ সাজিলে বৃন্দাবনে॥তুমি জগতের মাতা যোগী জনানুগতা,অনুগত জনের কৃপাকল্পলতা;–তোমায় মা ব’লে ডাকিলে নাকি কোলে লও ভক্তগণে॥দুঃখদৈন্যহারিণী, চৈতন্য কারিণী,আমি অন্য কিছু চাই না ভিন্ন চরণ দুখানি;—প্রেমসরোজে সাজাব পদ বাসনা মনে মনে॥পরিব্রাজক ভিখারী সাধ মনেতে ভারি,মধুর হাসিমাখা মায়ের মুখখানি হেরি;–ব’সে মায়ের কোলে, মা মা ব’লে নাচিব যোগধ্যানে॥