মানী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

কথা

আরঙজেব ভারত যবেকরিতেছিল খান্‌খান্‌—মারব পতি কহিলা আসিকরহ প্রভু অবধান—গোপনরাতে অচলগড়েনহর্ যাঁরে এনেছে ধ’রে

বন্দী তিনি আমার ঘরেসিরোহিপতি সুরতান,কী অভিলাষ তাঁহার পরেআদেশ মোরে করো দান।

শুনিয়া কহে আরঙজেবকী কথা শুনি অদ্‌ভুত।এতদিনে কি পড়িল ধরাঅশনিভরা বিদ্যুৎ।পাহাড়ি ল’য়ে কয়েক শতপাহাড়ে বনে ফিরিতে রত,মরুভূমির মরীচিমতোস্বাধীন ছিল রাজপুত।দেখিতে চাহি,—আনিতে তারেপাঠাও কোনো রাজদূত।

মাড়োয়া-রাজ যশোবন্তকহিলা তবে জোড়কর,—ক্ষত্রকুল-সিংহশিশুলয়েছে আজি মোর ঘর,—বাদ্‌শা তাঁরে দেখিতে চানবচন আগে করুন দান

কিছুতে কোনো অসম্মানহবে না কভু তাঁর পর,—সভায় তবে আপনি তাঁরেআনিব করি সমাদর।

আরঙজেব কহিলা হাসিকেমন কথা কহ আজ।প্রবীণ তুমি প্রবল বীরমাড়োয়াপতি মহারাজ।তোমার মুখে এমন বাণীশুনিয়া মনে শরম মানি,মানীর মান করিব হানিমানীরে শোভে হেন কাজ?কহিনু আমি, চিন্তা নাহি,আনহ তাঁরে সভামাঝ।

সিরোহিপতি সভায় আসেমাড়োয়ারাজে ল’য়ে সাথ;উচ্চশির উচ্চে রাখিসমুখে করে আঁখিপাত।কহিল সবে বজ্রনাদে“সেলাম করে বাদ্‌শাজাদে,”—

হেলিয়া যশোবন্ত-কাঁধেকহিলা ধীরে নরনাথ,—গুরুজনের চরণ ছাড়াকরিনে কারে প্রণিপাত।

কহিলা রোষে রক্ত আঁখিবাদ্‌শাহের অনুচর—“শিখাতে পারি কেমনে মাথালুটিয়া পড়ে ভূমিপর।”হাসিয়া কহে সিরোহিপতি“এমন যেন না হয় মতিভয়েতে কারে করিব নতি,জানিনে কভু ভয় ডর।”এতেক বলি দাঁড়াল রাজাকৃপাণ পরে করি ভর।

বাদশা ধরি সুরতানেরেবসায়ে নিল নিজপাশ।কহিলা, বীর, ভারত মাঝেকী দেশ পরে তব আশ।কহিলা রাজা “অচলগড়দেশের সেরা জগত-পর,”

সভার মাঝে পরস্পরনীরবে উঠে পরিহাস।বাদ্‌শা কহে “অচল হয়েঅচলগড়ে করো বাস।”