লীলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

বনবাণী — নটরাজ-ঋতুরঙ্গশালা

গগনে গগনে আপনার মনেকী খেলা তব।তুমি কত বেশে নিমেষে নিমেষেনিতুই নব।জটার গভীরে লুকালে রবিরে,ছায়াপটে আঁক এ কোন্ ছবি রে।মেঘমল্লারে কী বল আমারেকেমনে কব।

বৈশাখী ঝড়ে সেদিনের সেইঅট্টহাসিগুরু গুরু সুরে কোন্ দূরে দূরেযায় যে ভাসি।সে সােনার আলো শ্যামলে মিশালাে-শ্বেত উত্তরী আজ কেন কালাে।লুকালে ছায়ায় মেঘের মায়ায়কী বৈভব।

ওগো সন্ন্যাসী, কী গান ঘনালো মনে।গুরু গুরু গুরু নাচের ডমরুবাজিল ক্ষণে ক্ষণে।তোমার ললাটে জটিল জটার ভারনেমে নেমে আজি পড়িছে বারম্বার,বাদল আঁধার মাতালো তোমার হিয়া,বাঁকা বিদ্যুৎ চোখে উঠে চমকিয়া।চিরজনমের শ্যামলী তোমার প্রিয়াআজি এ বিরহদীপনদীপিকাপাঠালো তোমারে এ কোন লিপিকা,লিখিল নিখিল-আঁখির কাজল দিয়া,চিরজনমের শ্যামলী তোমার প্রিয়া।

মনে পড়িল কি ঘন কালো এলোচুলেঅগুরুধূপের গন্ধ।শিখিপুচ্ছের পাখা সাথে দুলে দুলেকাঁকন-দোলন-ছন্দ?মনে পড়িল কি নীল নদীজলেঘন শ্রাবণের ছায়া ছলছলে,মিলি মিলি সেই জল-কলকলেকলালাপ মৃদুমন্দ-

স্থকিত-পায়ের চলা দ্বিধাহত,ভীরু নয়নের পল্লব নত,না-বলা কথার আভাসের মতোনীলাম্বরের প্রান্ত?মনে পড়িছে কি কাঁখে তুলে ঝারিতরুতলে-তলে ঢেলে চলে বারি,সেচনশিথিল বাহু দুটি তারিব্যথায় আলসে ক্লান্ত।

ওগো সন্ন্যাসী, পথ যায় ভাসিঝরঝর ধারাজলেতমালবনের শ্যামল তিমিরতলে।দ্যুলোক ভূলোকে দূরে দূরে বলাবলিচিরবিরহের কথা।বিরহিণী তার নত আঁখি ছলছলিনীপ-অঞ্জলি রচে বসি গৃহকোণে,ঢেলে ঢেলে দেয় তোমারে স্মরিয়া মনে,ঢেলে দেয় ব্যাকুলতা।কভু বাতায়নে অকারণে বেলা বাহিআতুর নয়নে দু হাতে আঁচল ঝাঁপে।তুমি চিত্তের অন্তরে অবগাহিখুঁজিয়া দেখিছ ধৈরজ নাহি নাহি,মল্লার রাগে গর্জিয়া ওঠ গাহি,বক্ষে তোমার অক্ষের মালা কঁপে।

যাক যাক তব মন গলে গলে যাক,গান ভেসে গিয়ে দূরে চলে চলে যাক,বেদনার ধারা দুর্দাম দিশাহারাদুখদুর্দিনে দুই কূল তার ছাপে।কদম্ববন চঞ্চল ওঠে দুলি,সেইমতো তব কম্পিত বাহু তুলিটলমল নাচে নাচো সংসার ভুলি-আজ, সন্ন্যাসী, কাজ নাই জপে জাপে।