মুর্খু

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

শিশু ভোলানাথ

নেই বা হলেম যেমন তোমারঅম্বিকে গোঁসাই।আমি তো, মা, চাই নে হতেপণ্ডিতমশাই।নাই যদি হই ভালো ছেলে,কেবল যদি বেড়াই খেলে,তুঁতের ডালে খুঁজে বেড়াইগুটিপোকার গুটি,মুর্খু হয়ে রইব তবে?আমার তাতে কীই বা হবে—মুর্খু যারা তাদেরই তোসমস্তখন ছুটি।

তারাই তো সব রাখাল ছেলেগোরু চরায় মাঠে।নদীর ধারে বনে বনেতাদের বেলা কাটে।

ডিঙির ’পরে পাল তুলে দেয়,ঢেউয়ের মুখে নাও খুলে দেয়,ঝাউ কাটতে যায় চলে সবনদীপারের চরে।তারাই মাঠে মাচা পেতেপাখি তাড়ায় ফসল-খেতে,বাঁকে করে দই নিয়ে যায়পাড়ার ঘরে ঘরে।

কাস্তে হাতে, চুব্‌ড়ি মাথায়,সন্ধে হলে পরেফেরে গাঁয়ে কৃষাণ-ছেলে—মন যে কেমন করে।যখন গিয়ে পাঠশালাতেদাগা বুলোই খাতার পাতে,গুরুমশাই দুপুরবেলায়ব’সে ব’সে ঢোলে,হাঁকিয়ে গাড়ি কোন্‌ গাড়োয়ানমাঠের পথে যায় গেয়ে গান—শুনে আমি পণ করি যেমুর্খু হব ব’ল,।

দুপুরবেলায় চিল ডেকে যায়,হঠাৎ হাওয়া আসিবাঁশ-বাগানে বাজায় যেনসাপ-খেলাবার বাঁশি।পুবের দিকে বনের কোলেবাদল-বেলার আঁচল দোলে,ডালে ডালে উছলে ওঠেশিরীষফুলের ঢেউ।এরা যে পাঠ-ভোলার দলেপাঠশালা সব ছাড়তে বলে—আমি জানি এরা তো, মা,পণ্ডিত নয় কেউ।

যাঁরা অনেক পুঁথি পড়েনতাঁদের অনেক মান,ঘরে ঘরে সবার কাছেতাঁরা আদর পান।সঙ্গে তাঁদের ফেরে চেলা,ধুমধামে যায় সারা বেলা——আমি তো, মা, চাই নে আদরতোমার আদর ছাড়া।

তুমি যদি মুর্খু ব’লেআমাকে, মা, না নাও কোলেতবে আমি পালিয়ে যাববাদলা-মেঘের পাড়া

সেখান থেকে বৃষ্টি হয়েভিজিয়ে দেব চুল,ঘাটে যখন-যাবে, আমিকরব হুলুস্থুল।রাত থাকতে অনেক ভোরেআসব নেমে আঁধার ক’রে,ঝড়ের হাওয়ায় ঢুকব ঘরেদুয়ার ঠেলে ফেলে;তুমি বলবে মেলে আঁখি‘দুষ্টু দেয়া খেপল নাকি’,আমি বলব ‘খেপেছে আজতোমার মুর্খু ছেলে’।