চণ্ডিদাস ও বিদ্যাপতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সমালোচনা

এ ঘোর রজনী, মেঘের ঘটা,কেমনে আইল বাটে?আঙ্গিনার কোণে তিতিছে বঁধুয়া,দেখিয়া পরাণ ফাটে।

সই, কি আর বলিব তোরে,বহু পুণ্যফলে সে-হেন বঁধুয়াআসিয়া মিলল মোরে।ঘরে গুরুজন, ননদী দারুণ,বিলম্বে বাহির হৈনু–আহা মরি মরি, সংকেত করিয়াকত-না যাতনা দিনু।বঁধুর পিরীতি আরতি দেখিয়ামোর মনে হেন করেকলঙ্কের ডালি মাথায় করিয়াআনল ভেজাই ঘরে!রাধা শ্যামকে প্রথম দেখিয়াই বলিয়া উঠিলেন –এ ঘোর রজনী, মেঘের ঘটা,কেমনে আইল বাটে?আঙ্গিনার কোণে তিতিছে বঁধুয়াদেখিয়া পরাণ ফাটে!

সই, কি আর বলিব তোরে,বহু পুণ্যফলে সে-হেন বঁধুয়াআসিয়া মিলল মোরে!

“সই, কেমনে ধরিব হিয়া?আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়আমার আঙ্গিনা দিয়া!সে বঁধু কালিয়া না চায় ফিরিয়া,এমতি করিল কে?আমার অন্তর যেমন করিছেতেমনি হউক সে!

যাহার লাগিয়া সব তেয়াগিনু,লোকে অপযশ কয়,সেই গুণনিধি ছাড়িয়া পিরীতিআর জানি কার হয়!যুবতী হইয়া শ্যাম ভাঙ্গাইয়াএমতি করিল কে?আমার পরাণ যেমতি করিছেসেমতি হউক সে!

কহে চণ্ডিদাস, ‘শুন বিনোদিনী,সুখ দুখ দুটি ভাই?সুখের লাগিয়া যে করে পিরীতি,দুখ যায় তার ঠাঁই।'

“সই, পিরীতি না জানে যারা,এ তিন ভুবনে জনমে জনমেকি সুখ জানয়ে তারা?”

“বিধি যদি শুনিত, মরণ হইত,ঘুচিত সকল দুখ।”

“চণ্ডিদাস কয়, এমতি হইলেপিরীতির কিবা সুখ!”

“দারুণ ঋতুপতি যত দুখ দেল,হরিমুখ হেরইতে সব দূর গেল।যতহুঁ আছিল মঝু হৃদয়ক সাধসো সব পূরল পিয়া-পরসাদ।রভস-আলিঙ্গনে পুলকিত ভেল,অধরহি পান বিরহ দূর গেল।চিরদিনে বিহি আজু পূরল আশ,হেরইতে নয়ানে নাহি অবকাশ।ভনহ বিদ্যাপতি আর নহ আধি,সমুচিত ঔখদে না রহে বেয়াধি।”

“এই ভয় উঠে মনে, এই ভয় উঠে,না জানি কানুর প্রেম তিলে জনি ছুটে।গড়ন ভাঙ্গিতে, সই, আছে কত খল–ভাঙ্গিয়া গড়িতে পারে সে বড় বিরল।যথা তথা যাই আমি যত দূর পাই,চাঁদ মুখের মধুর হাসে তিলেকে জুড়াই।সে-হেন বঁধুরে মোর যে জন ভাঙ্গায়হাম নারী অবলার বধ লাগে তায়!চণ্ডিদাস কহে, রাই, ভাবিছ অনেক–তোমার পিরীতি বিনে সে জীয়ে তিলেক।”

“সে-হেন বঁধুরে মোর যে জন ভাঙ্গায়হাম নারী অবলার বধ লাগে তায়।”

“কি মোহিনী জান বঁধু, কি মোহিনী জান;অবলার প্রাণ নিতে নাহি তোমা হেন!

রাতি কৈনু দিবস, দিবস কৈনু রাতি–বুঝিতে নারিনু বঁধু তোমার পিরীতি!ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর–পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর।কোন্‌ বিধি সিরজিল সোতের সেঁওলি,এমন ব্যথিত নাই ডাকি বন্ধু বলি।বঁধু যদি তুমি মোরে নিদারুণ হওমরিব তোমার আগে, দাঁড়াইয়া রও।

“বঁধু যদি তুমি মোরে নিদারুণ হওমরিব তোমার আগে, দাঁড়াইয়া রও।”

“তোমারে বুঝাই বঁধু, তোমারে বুঝাই,ডাকিয়া শুধায় মোরে হেন কেহ নাই।”

“তোমারে বুঝাই বঁধু, তোমারে বুঝাই,ডাকিয়া শুধায় মোরে হেন কেহ নাই।অনুক্ষণ গৃহে মোরে গঞ্জয়ে সকলে,নিচয় জানিও মুঞি ভখিমু গরলে।এ ছার পরাণে আর কিবা আছে সুখ?মোর আগে দাঁড়াও, তোমার দেখিব চাঁদ মুখ।খাইতে সোয়াস্তি নাই, নাহি টুটে ভুক–কে মোর ব্যথিত আছে, কারে কব দুখ!”

“অনুক্ষণ গৃহে মোরে গঞ্জয়ে সকলে,নিচয় জানিও মুঞি ভখিমু গরলে।”

“যেন মলয়জ ঘষিতে শীতল,অধিক সৌরভময়,শ্যাম বঁধুয়ার পিরীতি ঐছন,দ্বিজ চণ্ডিদাস কয়!”

“পিরীতি পিরীতি সব জন কহে,পিরীতি সহজ কথা?বিরিখের ফল নহে ত পিরীতি,নাহি মিলে যথা তথা।পিরীতি অন্তরে, পিরীতি মন্তরে,পিরীতি সাধিল যেপিরীতি রতন লভিল সে জন–বড় ভাগ্যবান সে।পিরীতি লাগিয়া আপনা ভুলিয়াপরেতে মিশিতে পারে,পরকে আপন করিতে পারিলে,

পিরীতি মিলয়ে তারে।পিরীতি-সাধন বড়ই কঠিনকহে দ্বিজ চণ্ডিদাস,দুই ঘুচাইয়া এক অঙ্গ হওথাকিলে পিরীতি-আশ।”

“পিরীতি পিরীতি কি রীতি মূরতিহৃদয়ে লাগল সে–পরাণ ছাড়িলে পিরীতি না ছাড়ে,পিরীতি গড়ল কে?পিরীতি বলিয়া এ তিন আখরনা জানি আছিল কোথা!পিরীতি কণ্টক হিয়ায় ফুটল,পরাণপুতলী যথা।পিরীতি পিরীতি পিরীতি অনলদ্বিগুণ জ্বলিয়া গেল,

বিষম অনল নিবাইলে নহে,হিয়ার রহল শেল!”

“চণ্ডিদাস-বাণী শুন বিনোদিনি,পিরীতি না কহে কথা–পিরীতি লাগিয়ে পরাণ ছাড়িলেপিরীতি মিলয়ে তথা!”

“পিরীতি বলিয়া এ তিন আখর,এ তিন ভুবন- সার।”

“এই মোর মনে হয় রাতি দিনেইহা বই নাহি আর!”

পরাণ-সমান পিরীতি রতনজুকিনু হৃদয়-তুলে–পিরীতি রতন অধিক হইল,পরাণ উঠিল চূলে।

“নিতই নূতন পিরীতি দুজন,তিলে তিলে বাঢ়ি যায়।ঠাঞি নাহি পায় তথাপি বাড়ায়,পরিণামে নাহি খায়।”

সখিরে, কি পুছসি অনুভব মোয়!সোই পিরীতি অনুরাগ বাখানিতেতিলে তিলে নূতন হোয়।জনম অবধি হম রূপ নেহারনুনয়ন না তিরপিত ভেল,সোই মধুর বোল শ্রবণ হি শুননুশ্রুতিপথে পরশ না গেল।কত মধু-যামিনী রভসে গোয়ায়নুনা বুঝনু কৈছন কেল,লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু

তবু হিয়ে জুড়ন না গেল।যত যত রসিকজন রস-অনুগমন–অনুভব কহে, না পেখে!বিদ্যাপতি কহে প্রাণ জুড়াইতেলাখে না মিলল একে।”

শুন রজকিনী রামি,ও দুটি চরণ শীতল জানিয়াশরণ লইনু আমি।তুমি বেদ-বাগিনী,হরের ঘরণী,তুমি সে নয়নের তারা,তোমার ভজনে ত্রিসন্ধ্যা-যাজনে,তুমি সে গলার হারা।রজকিনীরূপ কিশোরীস্বরূপকামগন্ধ নাহি তায়,রজকিনী-প্রেম নিকষিত হেমবড়ু চণ্ডিদাসে গায়।

“রজনী দিবসে হব পরবশে,স্বপনে রাখিব লেহা–একত্র থাকিব নাহি পরশিবভাবিনী ভাবের দেহা।”

পিরীতিনগরে বসতি করিব,পিরীতে বাঁধিব ঘর।পিরীতি দেখিয়া পড়শি করিব,তা বিনু সকলি পর।