মানস-সুন্দরী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (1861–1941)

সোনার তরী

আজ কোন কাজ নয়;—সব ফেলে দিয়েছন্দ বন্ধ গ্রন্থ গীত—এস তুমি প্রিয়ে,আজন্ম-সাধন-ধন সুন্দরী আমারকবিতা, কল্পনা-লতা! শুধু একবারকাছে বস! আজ শুধু কূজন গুঞ্জনতোমাতে আমাতে; শুধু নীরবে ভুঞ্জনএই সন্ধ্যা-কিরণের সুবর্ণ মদিরা,—যতক্ষণ অন্তরের শিরা উপশিরালাবণ্য প্রবাহভরে ভরি’ নাহি উঠে,যতক্ষণে মহানন্দে নাহি যায় টুটে’চেতনা বেদনাবন্ধ, ভুলে যাই সবকি আশা মেটে নি প্রাণে, কি সঙ্গীতরবগিয়েছে নীরব হয়ে, কি আনন্দ সুধাঅধরের প্রান্তে এসে অন্তরের ক্ষুধানা মিটায়ে গিয়াছে শুকায়ে। এই শান্তি,এই মধুরতা, দিক্‌ সৌম্য ম্লান কান্তিজীবনের দুঃখ দৈন্য অতৃপ্তির পরকরুণ কোমল আভা গভীর সুন্দর!

বীণা ফেলে দিয়ে এস, মানস সুন্দরী,দুটি রিক্তহস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি’

কণ্ঠে জড়াইয়া দাও,—মৃণাল-পরশেরোমাঞ্চ অঙ্কুরি উঠে মর্ম্মান্ত হরষে,—কম্পিত চঞ্চল বক্ষ, চক্ষু ছলছল,মুগ্ধ তনু মরি যায়, অন্তর কেবলঅঙ্গের সীমান্ত প্রান্তে উদ্ভাসিয়া উঠে,এখনি ইন্দ্রিয়বন্ধ বুঝি টুটে টুটে!অর্দ্ধেক অঞ্চল পাতি’ বসাও যতনেপার্শ্বে তব; সুমধুর প্রিয় সম্বোধনেডাক মোরে, বল, প্রিয়, বল, প্রিয়তম;—কুন্তল-আকুল মুখ বক্ষে রাখি মমহৃদয়ের কানে কানে অতি মৃদু ভাষেসঙ্গোপনে বলে’ যাও যাহা মুখে আসেঅর্থহারা ভাবে-ভরা ভাষা! অয়ি প্রিয়া,চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়াবাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিয়ো না মুখ,উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখরেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরেসম্পূর্ণ চুম্বন এক, হাসি স্তরে স্তরেসরস সুন্দর;—নবস্ফুট পুষ্পসমহেলায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বৃন্ত নিরুপমমুখখানি তুলে’ ধোরো; আনন্দ আভায়বড় বড় দুটি চক্ষু পল্লব-প্রচ্ছায়রেখো মোর মুখপানে প্রশান্ত বিশ্বাসে,নিতান্ত নির্ভরে! যদি চোখে জল আসে

কাঁদিব দুজনে; যদি ললিত কপোলমৃদু হাসি ভাসি উঠে, বসি’ মোর কোলে,বক্ষ বাঁধি বাহুপাশে, স্কন্ধে মুখ রাখিহাসিয়ো নীরবে অর্দ্ধ-নিমীলিত আঁখি;যদি কথা পড়ে মনে তবে কলম্বরেবলে যেয়ো কথা, তরল আনন্দ ভরেনিঝরের মত, অর্দ্ধেক রজনী ধরি’কত না কাহিনী স্মৃতি কল্পনা লহরীমধুমাখা কণ্ঠের কাকলি; যদি গানভাল লাগে, গেয়ো গান; যদি মুগ্ধ প্রাণনিঃশব্দ নিস্তব্ধ শান্ত সম্মুখে চাহিয়াবসিয়া থাকিতে চাও, তাই র’ব প্রিয়া!হেরিব অদূরে পদ্মা, উচ্চ তটতলেশ্রান্ত রূপসীর মত বিস্তীর্ণ অঞ্চলেপ্রসারিয়া তনুখানি, সায়াহ্ন-আলোকেশুয়ে আছে; অন্ধকার নেমে আসে চোখেচোখের পাতার মত; সন্ধ্যাতারা ধীরে,সন্তর্পণে করে পদার্পণ, নদীতীরেঅরণ্যশিয়রে; যামিনী শয়ন অরদেয় বিছাইয়া, এক খানি অন্ধকারঅনন্ত ভুবনে। দোঁহে মোরা রব চাহি’অপার তিমিরে; আর কোথা কিছু নাহি,শুধু মোর করে তব করতল খানি,শুধু অতি কাছাকাছি দুটি জন প্রাণী

অসীম নির্জ্জনে; বিষন্ন বিচ্ছেদরাশিচরাচরে আর সব ফেলিয়াছে গ্রাসি’শুধু এক প্রান্তে তার প্রলয়-মগনবাকি আছে একখানি শঙ্কিত মিলন,দুটি হাত, ত্রস্ত কপোতের মত দুটিবক্ষ দুরুদুরু, দুই প্রাণে আছে ফুটি’শুধু এক খানি, ভয়, এক খানি আশা,এক খানি অশ্রুভরে নম্র ভালবাসা।

আজিকে এমনি তবে কাটিবে যামিনীআলস্য বিলাসে। অয়ি নিরভিমানিনী,অয়ি মোর জীবনের প্রথম প্রেয়সী,মোর ভাগ্য-গগনের সৌন্দর্য্যের শশি,মনে আছে, কবে কোন্ ফুল্ল যুথী বনে,বহু বাল্যকালে, দেখা হত দুই জনেআধ চেনা-শোনা’? তুমি এই পৃথিবীরপ্রতিবেশিনীর মেয়ে, ধরার অস্থিরএক বালকের সাথে কি খেলা খেলাতেসখি, আসিতে হাসিয়া, তরুণ প্রভাতেনবীন বালিকা মূর্ত্তি, শুভ্রবস্তু পরি’ঊষার কিরণ ধারে সামান্য করি’

বিকচ কুসুমদম ফুল্ল মুখখানিনিদ্রাভঙ্গে দেখা দিতে, নিয়ে যেতে টানি’উপবনে কুড়াতে শেফালি। বারে বারেশৈশব-কর্ত্তব্য হতে তুলায়ে আমারে,ফেলে দিয়ে পুঁথিপত্র, কেড়ে নিয়ে খড়ি,দেখায়ে গোপন পথ দিতে মুক্ত করিপাঠশালা কারা হতে; কোথা গৃহকোণেনিয়ে যেতে নির্জ্জনেতে রহস্য-ভবনে;জনশূন্য গৃহছাদে আকাশের তলেকি করিতে খেলা, কি বিচিত্র কথা বলে’ভুলাতে আমারে, স্বপ্নসম চমৎকারঅর্থহীন, সত্য মিথ্যা তুমি জান তার।দুটি কর্ণে দুলিত মুকুতা, দুটি করেসোনার বলয়, দুটি কপোলর পরেখেলিত অলক, দুটি স্বচ্ছ নেত্র হতেকাঁপিত আলোক, নির্ম্মল নির্ঝির স্রোতেচূর্ণরশ্মিসম। দোঁহে দোঁহা ভাল করে’চিনিবার আগে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসভরেখেলাধূলা ছুটাছুটি দুজনে সতত,কথাবার্ত্তা বেশবাস বিথান বিতত।

তার পরে এক দিন—কি জানি সে কবে—জীবনের বনে, যৌবন-বসন্তে যবে

প্রথম মলয় বায়ু ফেলেছে নিশ্বাস,মুকুলিয়া উঠিতেছে শত নব আশ,সহসা চকিত হয়ে আপন সঙ্গীতেচমকিয়া হেরিলাম—খেলাক্ষেত্র হতেকখন্ অন্তর-লক্ষ্মী এসেছ অন্তরেআপনার অন্তঃপুরে গৌরবের ভরেবসি আছ মহিষীর মত! কে তোমারেএনেছিল বরণ করিয়া? পুরদ্বারেকে দিয়াছে হুলুধ্বনি? ভরিয়া অঞ্চলকে করেছে বরিষণ নব পুষ্পদলতোমার আনম্ৰ শিরে আনন্দে আদরে?সুন্দর সাহানা রাগে বংশীর সুস্বরেকি উৎসব হয়েছিল আমার জগতে,যে দিন প্রথম তুমি পুষ্পফুল্ল পথেলজ্জামুকুলিত মুখে রক্তিম অম্বরেবধূ হয়ে প্রবেশিলে চির দিন তরেআমার অন্তর গৃহে—যে গুপ্ত আলয়েঅন্তর্যামী জেগে আছে সুখ দুঃখ লয়ে,যেখানে আমার যত লজ্জা আশা ভয়সদা কম্পমান, পরশ নাহিক সয়এত সুকুমার। ছিলে খেলার সঙ্গিনী,এখন হয়েছ মোর মর্ম্মের গৃহিণী,জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কোথা সেইঅমূলক হাসি অশ্রু, সে চাঞ্চল্য নেই,

সে বাহুল্য কথা। স্নিগ্ধদৃষ্টি সুগম্ভীরস্বচ্ছনীলাম্বর সম; হাসিখানি স্থিরঅশ্রু শিশিরেতে ধৌত; পরিপূর্ণ দেহমঞ্জরিত বল্লরীর মত; প্রতি স্নেহগভীর সঙ্গীত তানে উঠিছে ধ্বনিয়াস্বর্ণ বীণা-তন্ত্রী হতে রনিয়া রনিয়াঅনন্ত বেদনা বহি। সে অবধি প্রিয়ে,রয়েছি বিস্মিত হয়ে তোমারে চাহিয়েকোথাও না পাই অন্ত! কোন্ বিশ্বপারআছে তব জন্মভূমি? সঙ্গীত তোমারকত দূরে নিয়ে যাবে, কোন্ কল্পলোকেআমারে করিবে বন্দী, গানের পুলকেবিমুগ্ধ কুরঙ্গ সম? এই যে বেদনাএর কোন ভাষা আছে? এই যে বাসনাএর কোন তৃপ্তি আছে? এই যে উদারসমুদ্রের মাঝখানে হয়ে কর্ণধারভাসায়েছ সুন্দর তরণী; দশ দিশিঅস্ফুট কল্লোল ধ্বনি চির দিবানিশিকি কথা বলিছে কিছু নারি বুঝিবারে,এর কোন কুল আছে? সৌন্দর্য্য পাথারেযে বেদনা-বায়ু-ভরে ছুটে মনোতরী,সে বাতাসে, কত বার মনে শঙ্কা করিছিন্ন হয়ে গেল বুঝি হৃদয়ের পাল,অভয় আশ্বাস ভরা নয়ন বিশাল

হেরিয়া ভরসা পাই; বিশ্বাস বিপুলজাগে মনে—আছে এক মহা উপকূলএই সৌন্দর্য্যের তটে, বাসনার তীরেমোদের দোঁহার গৃহ!

হাসিতেছ ধীরেচাহি মোর মুখে, ওগো রহস্যমধুরা!কি বলিতে চাহ মোরে প্রণয়বিধুরাসীমন্তিনী মোর? কি কথা বুঝতে চাও?কিছু বলে’ কাজ নাই—শুধু ঢেকে দাওআমার সর্ব্বাঙ্গমন তোমার অঞ্চলে,সম্পূর্ণ হরণ করি লহ গো সবলেআমার আমারে; নগ্ন বক্ষে বক্ষ দিয়াঅন্তর-রহস্য তব শুনে নিই প্রিয়া!তোমার হৃদয়কম্প অঙ্গুলির মতআমার হৃদয়তন্ত্রী করিবে প্রহত,সঙ্গীত তরঙ্গ ধ্বনি উঠিবে গুঞ্জরি’সমস্ত জীবন ব্যাপি’ থর থর করি’!নাই বা বুঝিনু কিছু, নাই বা বলিনু,নাই বা গাঁথিনু গান, নাই বা চলিনুছন্দোবদ্ধ পথে, সলজ্জ হৃদয় খানিটানিয়া বাহিরে! শুধু ভুলে গিয়ে বাণীকাঁপিব সঙ্গীত ভরে, নক্ষত্রের প্রায়শিহরি জ্বলিব শুধু কম্পিত শিখায়,

শুধু তরঙ্গের মত ভাঙ্গিয়া পড়িবতোমার তরঙ্গ পানে, বাঁচিব মরিবশুধু, আর কিছু করিব না! দাও সেইপ্রকাণ্ড প্রবাহ, যাহে এক মুহুর্ত্তেইজীবন করিয়া পূর্ণ, কথা না বলিয়াউন্মত্ত হইয়া যাই উদ্দাম চলিয়া!

মানসীরূপিনী ওগো, বাসনা-বাসিনী,আলোকবসনা ওগগা, নীরবভাষিণী,পরজন্মে তুমি কিগো মূর্ত্তিমতী হয়েজন্মিবে মানব গৃহে নারীরূপ লয়েঅনিন্দ্য সুন্দরী? এখন ভাসিছ তুমিঅনন্তের মাঝে; স্বর্গ হতে মর্ত্ত্যভূমিকরিছ বিহার; সন্ধ্যার কনক বর্ণেরাঙ্গিছ অঞ্চল; ঊষার গলিত স্বর্ণেগড়িছ মেখলা; পূর্ণ তটিনীর জলেকরিছ বিস্তার, তলতল ছল ছলেললিত যৌবন খানি; বসন্ত বাতাসেচঞ্চল বাসনা ব্যথা সুগন্ধ নিশ্বাসেকরিছ প্রকাশ; নিসুপ্ত পূর্ণিমা রাতেনির্জ্জন গগনে, একাকিনী ক্লান্ত হাতেবিছাইছ দুগ্ধশুভ্র বিরহ শয়ন!শরৎ প্রত্যুষে উঠি করিছ চয়ন

শেফালি, গাঁথিতে মালা, ভুলে গিয়ে শেষে,তরুতলে ফেলে দিয়ে আলুলিত কেশেগভীর অরণ্য ছায়ে উদাসিনী হয়েবসে থাক; ঝিকিমিকি আলো ছায়া লয়েকম্পিত অঙ্গুলি দিয়ে বিকাল বেলায়বসন বয়ন কর বকুল তলায়!অবসন্ন দিবালোকে কোথা হতে ধীরেঘন পল্লবিত কুঞ্জে সরোবর তীরেকরুণ কপোত কণ্ঠে গাও মূলতান!কখন্ অজ্ঞাতে আসি ছুঁয়ে যাও প্রাণসকৌতুকে; করি দাও হৃদয় বিকল,অঞ্চল ধরিতে গেলে পালাও চঞ্চলকলকণ্ঠে হাসি’, অসীম আকাঙ্ক্ষা রাশিজাগাইয়া প্রাণে, দ্রুতপদে উপহাসিমিলাইয়া যাও নভোনীলিমার মাঝে।কখনো মগন হয়ে আছি যবে কাজেস্খলিত-বসন তব শুভ্র রূপখানিনগ্ন বিদ্যুতের আলো নয়নেতে হানিচকিতে চমকি’ চলি যায়!—জানালায়একেলা বসিয়া যবে আঁধার সন্ধ্যায়,—মুখে হাত দিয়ে, মাতৃহীন বালকেরমত, বহুক্ষণ কাঁদি, স্নেহ আলোকেরতরে; ইচ্ছা করি, নিশার আঁধার স্রোতেমুছে ফেলে দিয়ে যায় সৃষ্টিপট হতে

এই ক্ষীণ অর্থহীন অস্তিত্বের রেখা,তখন করুণাময়ী দা! তুমি দেখাতারকা-আলোক-জ্বালা স্তব্ধ রজনীরপ্রান্ত হতে নিঃশব্দে আসিয়া; অশ্রুনীরঅঞ্চলে মুছায়ে দাও; চাও মুখপানেস্নেহময় প্রশ্নভরা করুণ নয়ানে;নয়ন চুম্বন কর; স্নিগ্ধ হস্তখানিললাটে বুলায়ে দাও; না কহিয়া বাণীসান্ত্বনা ভরিয়া প্রাণে কবিরে তোমারঘুম পাড়াইয়া দিয়া কখন্‌ আবারচলে যাও নিঃশব্দ চরণে!

সেই তুমিমুর্ত্তিতে দিবে কি ধরা? এই মর্ত্ত্যভূমিপরশ করিবে রাঙা চরণের তলে?অন্তরে বাহিরে বিশ্বে শূন্যে জলে স্থলেসর্ব্ব ঠাঁই হতে, সর্ব্বময়ী আপনারেকরিয়া হরণ—ধরণীর এক ধারেধরিবে কি একখানি মধুর মুরতি?নদী হতে লতা হতে আনি তব গতিঅঙ্গে অঙ্গে নানা ভঙ্গে দিবে হিল্লোলিয়াবাহুতে বাঁকিয়া পড়ি’ গ্রীবায় হেলিয়াভাবের বিকাশ ভরে? কি নীল বসনপরিবে সুন্দরী তুমি? কেমন কঙ্কণ

ধরিবে দুখানি হাতে? কবরী কেমনেবাঁধিবে, নিপুণ বেণী বিনায়ে যতনে?কচি কেশগুলি পড়ি’ শুভ্র গ্রীবাপরেশিরীষ কুসুম সম সমীরণ ভরেকাঁপিবে কেমন? শ্রাবণে দিগন্ত পারেযে গভীর স্নিগ্ধদৃষ্টি ঘন মেঘভারেদেখা দেয়—নব নীল অতি সুকুমার,সে দৃষ্টি না জানি ধরে কেমন আকারনারীচক্ষে! কি সঘন পল্লবের ছায়,কি সুদীর্ঘ কি নিবিড় তিমির আভায়মুগ্ধ অন্তরের মাঝে ঘনাইয়া আনেসুখ বিভাবরী? অধর কি সুধাদানেরহিবে উন্মুখ, পরিপূর্ণ বাণীভরেনিশ্চল নীরব। লাবণ্যের থরে থরেঅঙ্গখানি কি করিয়া মুকুলি’ বিকশি’অনিবার সৌন্দর্য্যেতে উঠিবে উচ্ছ্বসি’নিঃসহ যৌবনে!

জানি, আমি জানি, সখি,যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখোচাখিসেই পরজন্ম-পথে,–দাঁড়াব থমকি’,নিদ্রিত অতীত কাঁপি’ উঠিবে চমকি’লভিয়া চেতনা!–জানি মনে হবে মমচির-জীবনের মোর ধ্রুবতারা সম

চিরপরিচয়-ভরা ঐ কালো চোখ!আমার নয়ন হতে লইয়া আলোক,আমার অন্তর হতে লইয়া বাসনাআমার গোপন প্রেম করেছে রচনাএই মুখখানি। তুমিও কি মনে মনেচিনিবে আমারে? আমাদের দুই জনেহবে কি মিলন? দুটি বাহু দিয়ে বালাকখনো কি এই কণ্ঠে পরাইবে মালাবসন্তের ফুলে? কখনো কি বক্ষ ভরিনিবিড় বন্ধনে, তোমারে হৃদয়েশ্বরীপারিব বাঁধিতে? পরশে পরশে দোঁহেকরি বিনিময়, মরিব মধুর মোহেদেহের দুয়ারে? জীবনের প্রতিদিনতোমার আলোক পাবে বিচ্ছেদবিহীন,জীবনের প্রতি রাত্রি হবে সুমধুরমাধুর্য্যে তোমার! বাজিবে তোমার সুরসর্ব্ব দেহে মনে? জীবনের প্রতি সুখেপড়িবে তোমার শুভ্র হাসি, প্রতি দুখেপড়িবে তোমার অশ্রুজল! প্রতি কাজেরবে তব শুভহস্ত দুটি। গৃহমাঝেজাগায়ে রাখিবে সদা সুমঙ্গল জ্যোতি।এ কি শুধু বাসনার বিফল মিনতি,

কল্পনার ছল? কার এত দিব্যজ্ঞান,কে বলিতে পারে মোরে নিশ্চয় প্রমাণ—পূর্ব্বজন্মে নারীরূপে ছিলে কি না তুমিআমারি জীবন-বনে সৌন্দর্য্যে কুসুমি’প্রণক্ষ বিকশি’? মিলনে আছিলে বাঁধাশুধু এক ঠাঁই, বিরহে টুটিয়া বাঁধাআজি বিশ্বময় ব্যাপ্ত হয়ে গেছ, প্রিয়ে,তোমারে দেখিতে পাই সর্ব্বত্র চাহিয়ে!ধূপ দগ্ধ হয়ে গেছে, গন্ধবাষ্প তারপূর্ণ করি ফেলিয়াছে আজি চারি ধার!গৃহের বনিতা ছিলে—টুটিয়া আলয়বিশ্বের কবিতারূপে হয়েছ উদয়,—তবু কোন্ মায়া-ডোরে চির-সোহাগিনীহৃদয়ে দিয়েছ ধরা, বিচিত্র রাগিণীজাগায়ে তুলিছ প্রাণে চিরস্মৃতিময়!তাই ত এখনো মনে আশা জেগে রয়আবার তোমারে পাব পরশ বন্ধনে!এমনি সমস্ত বিশ্ব প্রলয়ে সৃজনেজ্বলিছে নিবিছে, যেন খদ্যোতের জ্যোতি!কখনো বা ভাবময়, কখনো মুরতি।

রজনী গভীর হল, দীপ নিবে আসে;পর সুদূর পায়ে পশ্চিম আকাশে

কখন্ যে সায়াহ্নের শেষ স্বর্ণ-রেখামিলাইয়া গেছে, সপ্তর্ষি দিয়েছে দেখাতিমির গগনে, শেষ ঘট পূর্ণ করে’কখন্ বালিকা বধূ’ চলে গেছে ঘরে,—হেরি’ কৃষ্ণপক্ষ রাত্রি একাদশী তিথিদীর্ঘপথ শূন্যক্ষেত্র হয়েছে অতিথিগ্রামে গৃহস্থের ঘরে পান্থ পরবাসী,—কখন্ গিয়েছে থেমে কলরব রাশিমাঠপারে কৃষি-পল্লি হতে, নদীতীরেবৃদ্ধ কৃষাণের জীর্ণ নিভৃত কুটীরেকখন্ জ্বলিয়াছিল সন্ধ্যা-দীপ খানি,কখন্ নিভিয়া গেছে—কিছুই না জানি!

কি কথা বলিতেছিনু, কি জানি, প্রেয়সি,অর্দ্ধ-অচেতন ভাবে মনোমাঝে পশি’স্বপ্নমুগ্ধ মত! কেহ শুনেছিলে সে কি,কিছু বুঝেছিলে প্রিয়ে, কোথাও আছে কিকোন অর্থ তার? সব কথা গেছি ভুলে,শুধু এই নিদ্রাপূর্ণ নিশীথের কুলেঅন্তরের অন্তহীন অশ্রু-পারাবারউদ্বেলিয়া উঠিয়াছে হৃদয়ে আমারগম্ভীর নিস্বনে!

এস সুপ্তি, এস শান্তি,এস প্রিয়ে, মুগ্ধ মৌন সকরুণ কান্তি,বক্ষে মোরে লহ টানি,—শোয়াও যতনেমরণ-সুন্নিগ্ধ শুত্র বিস্মৃতি শয়নে!